রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৫ পূর্বাহ্ন
ছাত্র-জনতা ক্ষমতালিপ্সু নয়। যদি ক্ষমতার প্রতি তাদের মোহ থাকত, তাহলে ৫ আগস্টেই তারা সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিত, আর তখন বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক শক্তির এতটুকু সাহস থাকত না তাদের বিরোধিতা করার। কিন্তু ছাত্র-জনতা এমনটি করেনি। সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের বিজয়ের পরপরই আন্দোলনের সমস্ত শরিক দল ও সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন করা হয়েছে। এখনো তারা ক্ষমতার লোভকে প্রত্যাখ্যান করে জনতার আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
আজ রোববার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার রয়েল রিসোর্টে ‘আপনার চোখে নতুন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এসব কথা বলেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়কার অন্যতম এই নেতা বলেন, ‘আপনাদের প্রত্যাশা বিশাল। যদি আমরা সে প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হই, তাহলে ইতিহাসে আমাদের অবস্থান পূর্ববর্তী ব্যর্থ নেতৃত্বের চেয়ে আলাদা হবে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণের ফলে এক গণ–অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে। সেই চাপে খুনি হাসিনা লেজ গুটিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো তার কিছু সুবিধাভোগী দালাল দেশের বাইরে থেকে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।’
সারজিস আলম আরও বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে অনেকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে সক্রিয়। কিন্তু এখন সময় এসেছে সত্যিকারের নেতাকে চেনার। কঠিন সময়ে কে আপনাদের পাশে ছিল, আর কে সুবিধার আশায় আত্মগোপনে ছিল—তা মনে রাখতে হবে। গত ১৬ বছরে অনেক নেতা ছিলেন, যাদের সংকটময় সময়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি, অথচ এখন তারা নতুন রূপে ফিরে এসে জনগণের আবেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ও দখলদারিত্ব আগেও ছিল, এখনও চলছে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে জনগণের ঐক্য অপরিহার্য।’
তিনি আরও জানান, ‘আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর আসছে যে, কিছু রাজনৈতিক দল যারা ফ্যাসিস্টবিরোধী লড়াইয়ে ছিল, তারা এখন সুবিধা, অর্থ ও ক্ষমতার লোভে খুনিদেরই প্রশ্রয় দিচ্ছে। এমনকি, বিভিন্ন থানার কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও আদালতের নির্দিষ্ট কিছু বিচারকও খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।’ নেতাদের অন্ধ অনুসরণ না করে যৌক্তিক সমালোচনা করতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি।
সারজিস আলম জোর দিয়ে বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। যদি কোনো দল ৩০০ আসনও পায় আর কেউ না পায়, তাতেও আমাদের আপত্তি থাকবে না—শুধুমাত্র অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা যেন বাস্তবায়িত হয়। যদি কেউ নির্বাচনী কেন্দ্র প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তাহলে সেই কেন্দ্রটি পরিণত হবে আরেকটি গণ–অভ্যুত্থানের মঞ্চে।’
নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি কেবল ছাত্রদের জন্য নয়, বরং সব ধর্ম, মত, বয়স ও শ্রেণির মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আমরা অভ্যুত্থানের অন্যতম সহযোদ্ধা নাহিদ ইসলামকে জনতার প্রতিনিধিত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি। তবে কিছু মহল বিভাজন সৃষ্টি করতে চাইছে—নানা পদ-পদবির গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে দল ও দেশের স্বার্থে কোনো বিভেদ থাকবে না।’
জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সোনারগাঁ উপজেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য তুহিন মাহমুদ, পুলিশের গুলিতে আহত শাকিল আহম্মেদ, শহীদ মেহেদী হাসানের বাবা সানাউল্লাহ ও শহীদ ইমরান হোসেনের মা কোহিনুর আক্তার।