বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ন
ট্রেনের বাঁশির শব্দে জেগে উঠবে নতুন বগুড়া!
অনলাইন ডেস্ক
অবশেষে বগুড়ায় বাজতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ট্রেনের হুইসেল, হতে যাচ্ছে রেলের জংশন, আর ঝিকঝিক শব্দে ছুটে চলবে লোহার চাকা—সেই স্বপ্নে এখন ডুবে আছে বগুড়াবাসী। এখন যারা বগুড়া থেকে ঢাকায় রেলভ্রমণ করতে চান, তাদের নাটোর ও পাবনা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে, খরচও বেশি হয়। পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলো বর্তমানে চলাচল করে নওগাঁর সান্তাহার, নাটোর, পাবনার ঈশ্বরদী এবং সিরাজগঞ্জ হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার ঘুরে যায়। ফলে ট্রেনে ঢাকায় যেতে সময় লাগে প্রায় ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা। অথচ সড়কপথে বগুড়া থেকে ঢাকায় যেতে লাগে মাত্র ৬ ঘণ্টা। নতুন রেলপথ চালু হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকায় যাওয়া যাবে মাত্র ৫ ঘণ্টায়। তবে তা বাস্তবায়নে অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক বছর। ২০২৬ সালে শুরু হবে রেললাইন নির্মাণের কাজ, আর ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ চাকা ঘুরবে এই নতুন রুটে।
জানা গেছে, ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার যাত্রীদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সিরাজগঞ্জের জামতৈল থেকে বগুড়া পর্যন্ত একটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি হলেও জমি অধিগ্রহণের পর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধে তা থেমে যায়। পরে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। বাংলাদেশ সরকার ও ভারতীয় ঋণে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হলেও ভারত শেষ পর্যন্ত অর্থ না দেওয়ায় বিকল্প পথে এগোচ্ছে সরকার। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্পের আওতায় ৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মিত হবে, যা রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে। শুরুতে প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ ও নকশা চূড়ান্ত করতে বিলম্ব হওয়ায় তা হয়নি। ২০২১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরামর্শক নিয়োগ দিলে ২০২৩ সালের ৩০ জুন চূড়ান্ত নকশা তৈরি হয়। প্রকল্পে দুটি রেলপথ তৈরি হবে—একটি বগুড়ার ছোট বেলাইল থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত ৭৩ কিমি এবং আরেকটি কাহালু থেকে রানীরহাট পর্যন্ত ১২ কিমি। এই কাহালু-রানীরহাট রুট মূলত সান্তাহার থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনগুলো যেন বগুড়া স্টেশন ছাড়াই চলাচল করতে পারে, সে উদ্দেশ্যে নির্মিত হচ্ছে। রানীরহাট এবং সিরাজগঞ্জে নির্মিত হবে দুটি নতুন জংশন। আরও ছয়টি নতুন স্টেশন হবে শেরপুর, আড়িয়াবাজার, ছোনকা, চান্দাইকোনা, রায়গঞ্জ ও কৃষ্ণদিয়ায়। এসব তথ্য জানা গেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শফিউর রহমান স্বাক্ষরিত ১৬ জুনের একটি চিঠি থেকে। এতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে মূলধন ব্যয়ের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পি এম ইমরুল কায়েস জানিয়েছেন, বগুড়া অংশে ভূমি অধিগ্রহণে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার চাহিদা থাকলেও বরাদ্দ এসেছে ৯৬০ কোটি টাকা। অবশেষে প্রকল্পটির জমি অধিগ্রহণে অর্থ বরাদ্দ হওয়ায় বগুড়াবাসী আনন্দে উদ্বেলিত। প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় ছয় বছর পর এই বরাদ্দ এলো। এতে বগুড়ার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে বইছে খুশির হাওয়া। বগুড়া জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী অর্থবছর থেকে নির্মাণকাজ শুরু হবে, শেষ হবে ২০২৯ সালের শেষদিকে। কাজ শেষ হলে বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর ও লালমনিরহাট থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমবে, উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে আসবে গতি। ৮৪ কিমি নতুন রেলপথ নির্মাণে মোট ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে বগুড়ায় ৪৭৯ দশমিক ১৫ একর এবং সিরাজগঞ্জে ৪২০ দশমিক ৬৮ একর। বগুড়া জেলা প্রশাসক হোসনা আফরোজা জানিয়েছেন, জমি অধিগ্রহণের জন্য মোট বরাদ্দ ১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যার অর্ধেক ব্যয় হবে বগুড়া অংশে। বর্তমানে ৭ ধারার আপত্তি শুনানি চলছে, এরপর ৮ ধারার নোটিশ দেওয়া হবে এবং পর্যায়ক্রমে চেকের মাধ্যমে জমির মালিকদের টাকা পরিশোধ করা হবে। দেরির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত প্রতিশ্রুত অর্থ না দেওয়ায় সরকারকে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। টেন্ডার ডকুমেন্ট প্রস্তুত, এখন শুধু দাতা সংস্থা চূড়ান্ত হলেই টেন্ডার ডাকা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে ২০২৯ সালের শেষ দিকে ট্রেন চেপে ঢাকার পথে যাত্রা করতে পারবে উত্তরাঞ্চলবাসী।