রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন
দীর্ঘ ১০ দিনের টানা দুর্যোগের পর কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে শুরু করেছে। সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকে বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকায় জেলার প্রধান দুই নদী মাতামুহুরী ও বাঁকখালীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে। ফলে চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, ঈদগাঁও এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। বিকেলে সূর্যের দেখা মিললেও পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান গণমাধ্যমকে জানান, জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি ইউনিয়ন এবারের বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের ঘটনায় জেলায় মোট ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ২০ জন। নিহতদের মধ্যে ১১ ও ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৩ জন, কক্সবাজার শহরতলীর ছাত্তার ঘোনা, দরিয়ানগর ও ঝিরঝিরি পাড়ায় ৩ জন, চকরিয়ার বরইতলীতে ২ জন, পেকুয়ার টৈটংয়ে ১ জন এবং উখিয়ার হলদিয়া পালংয়ে ১ জন রয়েছেন।
অন্যদিকে পাহাড়ি ঢল ও বানের পানিতে ভেসে যাওয়া এবং পানিতে ডুবে মারা গেছেন আরও ১০ জন। তাদের মধ্যে রামুর কচ্ছপিয়ায় ১ জন, মহেশখালীর কুতুবজোমে ১ জন, পেকুয়ায় ১ শিশু এবং চকরিয়ার বরতলীতে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অপরদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশ করেছে বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। গত ১২ জুলাই প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বন্যায় মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৮২৭টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। খামার, পশুখাদ্য ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি মিলিয়ে আনুমানিক আর্থিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মারা যাওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ৪৬টি গরু, ১২৩টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, ১ লাখ ১১ হাজার ৯৮টি মুরগি এবং ১ হাজার ৫২১টি হাঁস। শুধু প্রাণীর মৃত্যুর কারণেই প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
এ ছাড়া বিভাগের ৩৬টি উপজেলার ১৫৬টি ইউনিয়নে গবাদিপশুর খাদ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে এই খাতে প্রায় ২৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে মোট ১৮ হাজার ৪৬৮ টন খড়, কাঁচা ঘাস ও দানাদার খাদ্য নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৯২০ টন খড়ের মূল্য প্রায় ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, ৬ হাজার ৪৩০ টন কাঁচা ঘাসের মূল্য ৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং ১১৮ টন দানাদার খাদ্যের মূল্য প্রায় ৭০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
বন্যার প্রভাবে বিভাগের ৩৩টি প্রাণিসম্পদ অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ২ হাজার ১২৬ একর চারণভূমি প্লাবিত হয়েছে এবং ৬৫টি খামারের ৮৩০টি পশুপাখি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৭২ লাখ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। সেখানে ৩৫টি গরু, ৮৭টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, ১ লাখ ৩৯৫টি মুরগি এবং ১ হাজারটি হাঁস মারা গেছে। প্রাণীর মৃত্যুর কারণে ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। খাদ্য ও খামারসহ মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
অন্যদিকে কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ৮টি গরু, ১২টি ছাগল, ৭ হাজার ৫০৩টি মুরগি এবং ৫২১টি হাঁস মারা গেছে। প্রাণীর মৃত্যুর কারণে ৭৭ লাখ ৯১ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। খাদ্য ও খামারসহ জেলায় মোট আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। বন্যার পানি সম্পূর্ণ সরে যাওয়ার পর মাঠ পর্যায়ে পুনর্মূল্যায়ন শেষে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসন এবং জরুরি পশুখাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সরকারি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।