মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:৫৯ অপরাহ্ন
স্বপ্নে মালয়েশিয়া, বাস্তবে বিমানবন্দরেই আটকে হাজার শ্রমিক!
অনলাইন ডেস্ক
বৈধ চ্যানেল বন্ধ থাকায় প্রতিদিনই হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া পাড়ি দিচ্ছেন। স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া এসব মানুষ পড়ছেন ভয়াবহ বিপদে। কুয়ালালামপুর থেকে সোমবার (১৯ মে) ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিএস ৩১৬ ফ্লাইটে ৪০ জন বাংলাদেশি ফেরত এসেছেন। তারা সবাই টুরিস্ট ভিসায় শ্রমিক হিসেবে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর তাদের ফেরত পাঠানো হয়। এদের প্রত্যেকেই তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করেছেন ভিসা ও দালাল খরচে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে এভাবে আটকা পড়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন আরও হাজারখানেক শ্রমিক। অভিবাসন ক্যাম্পেও হাজার হাজার মানুষ বন্দি হয়ে দুর্বিষহ সময় পার করছেন।
ফেরত আসা মুন্সীগঞ্জের হেলেনা বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে সুদের ওপর সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন ১৬ মে। টুরিস্ট ভিসা ছিল ২২ দিনের। তাকে বলা হয়েছিল, কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর কন্ট্রাক্ট করা লোক এসে নিয়ে যাবে। কিন্তু বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের সন্দেহ হলে তাকে আটক করা হয়। তিন দিন পর ফেরত পাঠানো হয়। হেলেনা বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে কষ্টে দিন যাচ্ছিল। তাই দালালের লোভনীয় প্রস্তাবে বিশ্বাস করে ভিসার ফাঁদে পা দেন। তার মতো বিমানবন্দরে আরও হাজারখানেক মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে জানান তিনি, যাদের অনেকেই বাংলা ভাষায় কথা বলায় তাদের বাংলাদেশি বলে ধারণা করছেন।
একই ফ্লাইটে ফিরেছেন শরিয়তপুরের ইলিয়াস হোসেন। তিনি জানান, ১৬ মে সকালে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর পৌঁছান। বিমানবন্দরে নামার পরপরই এক লাখ টাকা দেন দালালকে। সেই দালাল বারবার বলেন, “আর এক ঘণ্টা পর বের হবো, আর দুই ঘণ্টা থাকেন।” দুই দিন ধরে ঘুরিয়েছেন। খাবার ছিল না, পানি ছিল না। যারা কিছু টাকা সঙ্গে এনেছিলেন তারা বিমানবন্দরের দোকান থেকে অল্প কিছু কিনে খেয়েছেন, বাকিরা উপোস ছিলেন।
১৮ মে দালালরা বলেন, “ইমিগ্রেশনে গিয়ে ধরা দেন, বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছি।” এরপর ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের আটক করে একদিন হেফাজতে রাখে, ১২০ রিঙ্গিত জরিমানা করে এবং পরে ইউএস বাংলার ফ্লাইটে তুলে দেয়। ইলিয়াস জানান, তার কাছ থেকে দালাল শাহ আলম সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়েছেন। তার দাবি, শুধু তিনি নন—বিমানবন্দরে আরও হাজারের বেশি বাংলাদেশি আটকা পড়ে আছেন। একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন যশোরের পাইকগাছার রবিউল হোসেনও।
দালাল শাহ আলম গণমাধ্যমকে জানান, তিনি বারিধারার হিউম্যান রিসোর্স লিমিটেডের হয়ে কাজ করেন। মালয়েশিয়ায় আফিয়া ওভারসীসের আলতাব খানের লোকজন শ্রমিকদের গ্রহণ করার কথা ছিল। কিন্তু ইমিগ্রেশন আটকে দেওয়ায় তারা পারেননি।
ইলিয়াস বলেন, “ইমিগ্রেশন অফিসের ছোট একটি কক্ষে একসঙ্গে শতাধিক মানুষকে রাখা হয়েছে। যাদের ফেরত টিকিট ও জরিমানার টাকা আছে তারা ফিরছেন, আর বাকিরা জেলে। আমার পাশে থাকা এক লোকের জরিমানার টাকা ছিল না, তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।”
এদিকে মালয়েশিয়ার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা সংস্থা (একেপিএস) সোমবার জানায়, কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে ছয় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে না যাওয়ায় ১১২ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তারা আরও জানায়, এসব মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে ইমিগ্রেশন এড়াতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করছিল এবং কাউকে খুঁজছিল বলে সন্দেহ হয়। পরবর্তীতে তদন্ত শেষে তাদের ফেরত পাঠানো হয়। এদের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিক রয়েছে। কতজন বাংলাদেশি, সেটি নির্দিষ্ট করে বলেনি সংস্থাটি।
মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর (রাজনৈতিক) প্রনব কুমার ভট্টাচার্য্য গণমাধ্যমকে বলেন, “প্রায় প্রতিদিনই টুরিস্ট ভিসায় শ্রমিক প্রবেশের চেষ্টা করছে। কেউ কেউ আবার ট্রলারযোগে নৌপথে আসছে। এসবের পেছনে রয়েছে এক শ্রেণির অসাধু রিক্রুটিং ও ট্রাভেল এজেন্সি।”
বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানিকারকরা জানান, বায়রার বহিষ্কৃত নেতা ফকরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পথে শ্রমিক পাঠিয়ে আসছেন। আফিয়া ওভারসীসের মালিক আলতাব খান কুয়ালালামপুরে ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে এসব শ্রমিকদের বের করে নেন। কিন্তু যারা কাজে না পেয়ে পালিয়ে বেড়ান, দিনশেষে ধরা পড়েন এবং ফেরত পাঠানো হয়।
বায়রার এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার যখনই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে চায় তখনই এই চক্রটি বাধা দেয়। কারণ বৈধ বাজার খুললে তাদের অবৈধ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আফিয়া ওভারসীসের মালিক আলতাব খানের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের মামলা হয়েছে, পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে, জামিনে বের হয়ে আবারও একই কাজ করছেন। একই চক্র টেকনাফ, কক্সবাজার ও পটুয়াখালী থেকে ট্রলারযোগে মানবপাচারের সঙ্গেও জড়িত।
বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, “শ্রমিকরা যেকোনোভাবে কাজের সুযোগ খোঁজেন। বৈধ পথ না থাকলে তারা অবৈধ পথে যান। তাই শ্রমবাজার দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে উন্মুক্ত করা জরুরি। যারা অবৈধভাবে শ্রমিক পাঠান, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
পরিশেষে, অবৈধ পথে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ না হলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুঃখের এই কাহিনি চলতেই থাকবে—যেখানে লাখ টাকার ঋণ নিয়ে স্বপ্নের বদলে অপেক্ষা করে বিমানবন্দর আর কারাগারের চার দেয়াল।