শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন
দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নানা জল্পনা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সম্পন্ন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত গণভোট। বহু আলোচিত এই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের পথেই দেশের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলে। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দেন নাগরিকরা। বড় কোনো সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে এগিয়ে থেকে সরকার গঠনের পথে রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পরপরই সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান কীভাবে হবে, আর কে শপথ পড়াবেন?
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকারই নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ করান। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সংসদ কার্যত বিলুপ্ত এবং স্পিকারের পদও শূন্য। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শপথ গ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে কিছু অনিশ্চয়তা।
তাহলে এই পরিস্থিতিতে শপথ পড়াবেন কে?
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যক্তি শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন। যদি নির্ধারিত ব্যক্তি কোনো কারণে এই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হন বা না করেন, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন, যেন তিনিই এই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি।
সহজভাবে বিষয়টি দাঁড়ায় এভাবে—
প্রথমত, রাষ্ট্রপতি শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য একজন ব্যক্তিকে মনোনীত করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ করাতে না পারলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব নেবেন।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত ৫ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে জানান, নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তর দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি চাইলে কাউকে মনোনীত করতে পারেন—উদাহরণ হিসেবে প্রধান বিচারপতির নামও আলোচনায় আসতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদি রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া না হয় বা প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাবেন। তবে সে ক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হবে। সরকারের ইচ্ছা হলো নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা।
এবার প্রশ্ন আসে—শপথ গ্রহণের সময়সীমা কত?
সাধারণভাবে দেখা যায়, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যেই শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। নির্বাচন কমিশন যে বেসরকারি ফলাফল প্রকাশ করে, সেটি আনুষ্ঠানিক ফল হিসেবে গণ্য হয় না।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল অবশ্যই ‘সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত’ হতে হবে। এই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ থেকেই তিন দিনের সময়সীমা গণনা শুরু হবে। অর্থাৎ বেসরকারি ফল প্রকাশের পর সরকারি গেজেট প্রকাশ হতে কয়েক দিন সময় লাগলে, সেই সময়টুকু অতিরিক্ত হিসেবে ধরা হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সংবিধানেই শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই অনুসরণ করে নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা শপথ নেবেন এবং সেখান থেকেই শুরু হবে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা।
সূত্র : বিবিসি বাংলা