শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১০ অপরাহ্ন
আজকের কিশোর অপরাধী নয়, হতে পারে আগামী দিনের নেতা।
গোলাম কিবরিয়া, রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি
পত্রিকার পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে চমকে ওঠার মতো একের পর এক খবর—মাত্র ১৩-১৪ বছরের কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। হাতে দেশি অস্ত্র, কোমরে ছুরি, চোখে বিদ্রোহের আগুন—এরা এখন আর নিষ্পাপ স্কুলবয় নয়, বরং একেকজন হয়ে উঠছে সমাজের আতঙ্ক। এক সময় যে ছেলেটির হাতে খাতা-কলম থাকার কথা, তার হাতে এখন রড, চাপাতি কিংবা তাজা বোমা! এমনটা হঠাৎ করে হয়নি, দিনে দিনে গড়ে উঠেছে এই অন্ধকার জগতের সূচনালিপি।
প্রশ্ন জাগে—কেন এমনটা ঘটছে? কেন একজন কোমলমতি কিশোর, যে কিনা স্বপ্ন দেখার কথা, ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে গড়ে তোলার কথা, সে কীভাবে হয়ে উঠছে অপরাধ জগতের অংশ? এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে, কিন্তু পরিবারই এই সমস্যার শেকড়ের অনেকটাই ধারণ করে আছে। অনেক বাবা-মা হয়তো দিনশেষে এতটাই ক্লান্ত বা ব্যস্ত থাকেন, সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশে, কী করে—এসব জানার চেষ্টাটুকুও করেন না। আবার কেউ কেউ ভাবেন, প্রযুক্তির যুগে সন্তান নিজের মতো করেই বড় হয়ে যাবে, কিংবা তাদের স্বাধীনতা দিতেই হবে। কিন্তু এই ‘স্বাধীনতা’ কখন যে ‘অবাধ্যতা’ বা ‘অপথে যাওয়া’য় পরিণত হয়, তা বোঝার আগেই অনেক সময় সব শেষ হয়ে যায়।
বর্তমানে প্রযুক্তি যেমন মানুষের জীবনে অগ্রগতির দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি অন্ধকার গলিও তৈরি করে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম কিংবা বিভিন্ন গেমিং অ্যাপের আড়ালে তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং, যাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজন পড়ে না কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা আড্ডার। তারা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মেই পরিকল্পনা করে অপরাধের, ঠিক করে কে কার উপর আক্রমণ করবে, কিভাবে চুরি বা ছিনতাই করবে, এমনকি কখন হত্যা করবে!
এই উঠতি বয়সে কিশোরদের মধ্যে থাকে এক ধরনের আত্মপ্রত্যয় ও উন্মাদনা—তারা চায় নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা প্রমাণ করতে, সাহসী ও আধিপত্যশীল হিসেবে দেখতে। এই মানসিক দুর্বলতা বা পরিচয় খোঁজার আকাঙ্ক্ষাকে ব্যবহার করছে অপরাধী গোষ্ঠী, যারা এসব কিশোরদের কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। তারা বুঝে ফেলে এই কিশোরদের এখনও বুঝ-বিবেচনা পরিপক্ব নয়, ফলে সহজেই চালনা করা যায়।
এমনকি এই গ্যাং কালচারের মধ্যে এক ধরনের গ্ল্যামারাইজেশন তৈরি হয়েছে—কে কতটা ভয়ানক, কে কত বড় অপরাধ করেছে, সেটাই হয়ে উঠছে গর্বের বিষয়। তারা একে অপরের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, কে কতটা ‘দাগি’ সেটা প্রমাণ করতে। অনেক সময় এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে নেশাদ্রব্যও বড় ভূমিকা রাখে—ছোট ছেলেরা গোপনে গাঁজা, ইয়াবা বা ফেনসিডিলের মতো মাদক গ্রহণ করে, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
অবশ্য কেবল কিশোররা নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গিতেও রয়েছে দুর্বলতা। অপরাধ করে ধরা পড়লেও অনেক সময় সহজে ছেড়ে দেওয়া হয় এই অজুহাতে যে তারা ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’। ফলে তারা বুঝে যায়, অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়া যায়, এবং তা এক প্রকার উৎসাহে পরিণত হয়। অন্যদিকে কিছু কিছু এলাকায় রাজনৈতিক স্বার্থে বা প্রভাব বিস্তারের জন্য এই কিশোরদেরই ব্যবহার করা হচ্ছে বাহিনী হিসেবে—তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে অস্ত্র, শেখানো হচ্ছে স্লোগান, আর ব্যবহার করা হচ্ছে ঢাল হিসেবে।
কিন্তু আমরা কি এভাবেই সমাজকে ছেড়ে দেব? আমাদের কি দায় নেই এদের বিপথগামীতা রোধ করার? বরং প্রতিটি পরিবারে, প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়, স্কুল-কলেজে গড়ে তুলতে হবে সচেতনতার বলয়। বাবা-মা হিসেবে সন্তানকে সময় দিন—প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় তার সঙ্গে কথা বলুন, বুঝুন তার মনের অবস্থান, তার বন্ধুবান্ধব কারা, সে কোথায় যায়, কী করে, মোবাইলে কী দেখে, কী ধরনের মেসেজ আদানপ্রদান করে। সন্তানকে শাসনের পাশাপাশি ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধুন, যাতে সে আপনার থেকে কিছু লুকোতে না চায়।
অপরাধ দমন কেবল পুলিশ বা আইনের দায়িত্ব নয়—এটা শুরু হওয়া উচিত ঘর থেকেই। যখন সন্তান আপনাকে বন্ধু ভাবতে পারবে, তখনই সে কোনো গ্যাং বা অপরাধের চক্রে না গিয়ে আপনার কাছে দুঃখ বা সমস্যার কথা বলতে পারবে। তাকে স্বপ্ন দেখান, তার জীবনের লক্ষ্য গড়ে তুলতে সাহায্য করুন। তাকে বোঝান, সে একদিন দেশের জন্য কিছু করতে পারবে, সমাজের গর্ব হতে পারবে—এই বিশ্বাসটা তার মনে গেঁথে দিন।
একটা কিশোর যদি সন্ত্রাসী হতে পারে, তবে সেই কিশোরই হতে পারে আগামী দিনের বিজ্ঞানী, ডাক্তার, শিক্ষক কিংবা দেশনায়ক—শুধু প্রয়োজন যথাসময়ে তার পাশে থেকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার। আজ যারা ছোট, তারাই তো আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই আর দেরি নয়—এখনই সময় আপনার সন্তানের খোঁজ নেওয়ার, তার পাশে দাঁড়ানোর, এবং তাকে আলোর পথে পরিচালিত করার।
আপনার সন্তানই একদিন গড়ে তুলবে একটি সুন্দর বাংলাদেশ—এই বিশ্বাস নিয়ে তাকে গড়ে তুলুন। কারণ আজ আপনি যতটা যত্নবান হবেন, আগামীকাল সে ততটাই গর্বিত করবে আপনাকে।
আপনি আপনার সন্তানকে কতটা সময় দেন প্রতিদিন?