বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৯ অপরাহ্ন
বেলা তিনটা পেরিয়ে যখন মেট্রোরেল ধরে শাহবাগে নামলাম, তখনই অনুভব করা যাচ্ছিল আজকের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশের চিত্র কেমন হতে পারে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির ঘোষিত ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচির কথা বলছি।
জাতীয় জাদুঘরের সামনের রাস্তা থেকে ক্যাম্পাসের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হতে হতে একের পর এক মিছিল চোখে পড়ল। ছোট ছোট দলগুলো নানা স্লোগানে এগিয়ে চলেছে। আজ ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ে কোনো রকম কড়াকড়ি চোখে পড়েনি, যা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে নানা সমালোচনা চলছিল।
টিএসসি এবং রাজু ভাস্কর্যের কাছে পৌঁছে চারদিক থেকে অসংখ্য মিছিলের ভিড় দেখা গেল। তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষকেও দেখা গেল। পতাকা বিক্রেতাদের কাছেও ব্যস্ততা লক্ষ্য করা গেল। জাতীয় পতাকা, ফিলিস্তিনের পতাকা, কালেমা খচিত পতাকা কিনে সেগুলো মিছিলের শীর্ষে উড়াচ্ছিলেন অনেকে। মিছিলের পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে শহীদ মিনারের দিকে এগোচ্ছিলাম। এর আগে ৩ আগস্ট একইভাবে শহীদ মিনারে গিয়েছিলাম, সেই স্মৃতিই মনে পড়ছিল।
গত শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ৩১ ডিসেম্বর নিয়ে নানা ইঙ্গিত দিতে শুরু করেন। তারা বলছিলেন, এই দিনেই ‘প্রোক্লেমেশন অব সেকেন্ড রিপাবলিক’ ঘোষণা করা হবে। সেখানে ‘মুজিববাদের অবসান’ ঘটানোর কথা উল্লেখ করা হয়।
এই বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ কী? সেদিন কী ঘটতে যাচ্ছে? কেউ পরিষ্কার ধারণা করতে পারছিল না। কেউ কেউ ধারণা করছিলেন, হয়তো সংবিধান বাতিলের ঘোষণা আসবে, অথবা নতুন কোনো রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ হবে। অনেকে ভাবছিলেন, সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রদের প্রতিনিধি উপদেষ্টারা পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন।
এমন অনেক ধোঁয়াশার মধ্যেই দ্রুত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সেদিন ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ পাঠ করা হবে। এটিই ‘প্রোক্লেমেশন অব সেকেন্ড রিপাবলিক’ হিসেবে গণ্য হবে। এই ঘোষণার মাধ্যমে মূলত জুলাই বিপ্লবকে একটি লিখিত স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এটি হবে জুলাই বিপ্লবের ইশতেহার।
ছাত্রনেতাদের দাবি ছিল, এই স্বীকৃতি সরকারের তরফ থেকে আসতে হবে। কিন্তু সরকার যখন তা করছে না, তখন তারাই দায়িত্ব নিয়ে বিষয়টি সামনে আনছেন। বিশাল জমায়েতের মাধ্যমে এই ঘোষণা দিয়ে সরকারকে একপ্রকার বাধ্য করা হবে যেন এটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের একজন সক্রিয় কর্মী এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্যের সঙ্গে আলাপ করে এসব জানতে পারি।
এই ঘোষণাপত্র পাঠ নিয়ে সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে নানা জল্পনা শুরু হয়। একদিকে সরকার জানায়, এই কর্মসূচির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই, আবার অন্যদিকে বলে, সরকার নিজেই জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র দেবে।
এর ফলে ছাত্রদের পক্ষ থেকে ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে কি না, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত হবে কি হবে না, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন, তারা মাঝপথে ফিরে যাবেন কি না, এসব নিয়ে একপ্রকার দ্বিধার সৃষ্টি হয়।
অবশেষে গভীর রাতে নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ঘোষণাপত্র পাঠের পরিবর্তে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন ছাত্রনেতারা। তারা জানান, সরকার সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে এই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করবে। তাই তারা শুরুর পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন।
মধ্যরাতে ঘোষিত কর্মসূচি সফল হবে কি না, সেখানে জমায়েত হবে কি না, এমন প্রশ্নও উঠেছিল। এমন কথাও শোনা যাচ্ছিল যে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ইসলামী ছাত্রশিবিরের সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীরা এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। তবে শাহবাগ থেকে শহীদ মিনারের দিকে যেতে গিয়ে বুঝলাম, ঢাকার বাইরে থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ এসেছে। তরুণ ও শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।
৩ আগস্টের সমাবেশের সঙ্গে তুলনা করলে আজকের জমায়েত কিছুটা কম ছিল। ঢাকার মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ এবং অভিভাবকদের তেমন উপস্থিতি দেখা যায়নি। সেদিনের মতো ডান-বাম, ছোট-বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণও আজ তেমন ছিল না। মিছিলের সামনে কিছু নারী দেখা গেলেও তাদের সংখ্যা ছিল কম।
তবুও, এটি বড় একটি সমাবেশ বলা চলে। ছাত্র-জনতার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও মিছিল নিয়ে এসেছিলেন। তফসিলি সম্প্রদায়, রিকশাচালক, এমনকি চাকরিচ্যুত পুলিশ পরিবার এবং পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নিপীড়িত বিডিআর সদস্যদের পরিবারও উপস্থিত ছিল।
বক্তৃতাগুলোতে মূলত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করা হয়। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের দাবি জানানো হয়। মুজিববাদী সংবিধান বাতিল এবং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা বিলোপের দাবিও জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়। ১৫ জানুয়ারির মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশের আলটিমেটাম দেওয়া হয়।
কর্মসূচির বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে এটিকে এক ধরনের শোডাউন মনে হলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে বাস ভাড়া করে লোকজন এসেছে। ঢাকার বাইরের ছাত্র-জনতাই ছিল প্রধান অংশগ্রহণকারী।
সন্ধ্যায় কর্মসূচি শেষে যখন ফিরছিলাম, তখনও মিছিল এবং স্লোগান চলছিল। টিএসসিতে এসে দেখলাম মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা শেখ হাসিনার বিশাল ছবি লক্ষ্য করে জুতা ছুঁড়ছেন অনেকে। এই ‘ঘৃণাস্তম্ভ’ ৩ আগস্ট রচনা করেছিল ছাত্র-জনতা। যদিও কয়েক দিন আগে এটি মুছে ফেলা হয়েছিল, কিন্তু আবার আঁকা হয়েছে।
শাহবাগে মেট্রোরেলের লাইনে দাঁড়িয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলো। তারা রংপুরের পীরগাছা থেকে এসেছেন। রাতেই ফিরবেন, তবে আগারগাঁও ঘুরে যাবেন। পারভেজ উদ্দীন নামের একজন স্কুলছাত্র জানাল, সে আজকের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আনন্দিত। পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো দিয়ে আর কিছু হবে না বলে তার বিশ্বাস। নতুন কিছু করতে চায় ছাত্ররাই।
পারভেজের মতো দেশের প্রান্তিক এলাকার নতুন প্রজন্মের মানুষকে উজ্জীবিত দেখলাম। নতুন বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যেন তারা নতুন রাজনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশে কী অপেক্ষা করছে, তা দেখার পালা।