শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০৩:৪০ অপরাহ্ন
বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়া বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুরু হতে যাচ্ছে ভোট গণনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলে। সারাদেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনের ৪২ হাজার ৯৫৮টি কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে গঠিত হবে নতুন নির্বাচিত সরকার, যা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় দেশের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখবে। প্রায় দেড় যুগ পর নাগরিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আগামী পাঁচ বছরের জন্য নেতৃত্ব নির্ধারণে ভোটাররা তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। ফলে দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি কার্যকর নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হলো।
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে রাষ্ট্রীয় সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন। জাতির ভবিষ্যৎ কাঠামো পুনর্গঠনের প্রশ্নে এই গণভোটকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি অংশ নেয়। বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে ছিল। ফ্যাসিবাদী শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
নির্বাচন ঘিরে সারাদেশে উৎসবের আবহ লক্ষ্য করা গেছে। ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সাপ্তাহিক বন্ধের সঙ্গে মিলিয়ে চারদিনের ছুটি দেওয়া হয়, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট দিতে পারেন। রাজধানীর বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে ঈদের সময়ের মতো ভিড় দেখা যায়। অনেকেই গ্রামে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। দীর্ঘ ১৫ বছর পর প্রথমবার ভোট দিতে পেরে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ছিল বাড়তি উৎসাহ।
নির্বাচনী প্রচারণায় ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ প্রচারযানের অনুমতি দিয়ে পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত করা হয়। নির্বাচনকে সুষ্ঠু রাখতে এক লাখ সেনাসদস্যসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
প্রচারের ধরন ছিল প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যতিক্রমী। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই প্রার্থীরা প্রচার শেষ করেন। একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই সনদ’ নামে সংবিধান সংস্কার বিষয়ক গণভোট আয়োজন এ নির্বাচনকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। ভোটাররা সংসদের জন্য সাদা ও গণভোটের জন্য গোলাপি ব্যালট ব্যবহার করেন।
প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার এবারের নির্বাচনে অংশ নেন, যা মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ। নিরাপত্তা জোরদারে কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি, ২৫ হাজার ৭০০ বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা এবং প্রায় এক হাজার ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ১২০ জন।