রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩১ পূর্বাহ্ন
যাকে মারতে চেয়েছিল সাদ্দাম, তিনিই ইতিহাস বদলান!
অনলাইন ডেস্ক
ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস! যাকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন, তাকেই শেষমেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। বরং ইরানের বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি সুস্থ শরীরে থেকে গেছেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। যেখানে তার ছিল স্বাভাবিক পরিণতি, সেখানে সাদ্দামের পরিণতি হয়েছে ভয়ংকর নির্মম।
যদি সেই মুহূর্তে খামেনিকে হত্যা করতে পারতেন সাদ্দাম, তবে হয়তো ইরানে ইসলামিক বিপ্লবই আসত না। এমনকি ইরান-ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহতাও দেখা যেত না। কিন্তু সেই মোক্ষম সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি সাদ্দাম হোসেন। আর সেই ব্যর্থতারই ফল তাকে ভোগ করতে হয় দীর্ঘ সময় ধরে।
সেই সময়টি ছিল ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে। সাদ্দাম তখন ইরাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ইরানের রাজা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে তিনি দেন এক বিস্ময়কর প্রস্তাব—খামেনিকে হত্যা করার। সে সময় খামেনি ছিলেন নির্বাসিত, অবস্থান করছিলেন ইরাকের নাজাফে, সেখান থেকে তিনি পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন।
১৯৬৪ সালে ইরান থেকে নির্বাসিত হন খামেনি। তবে সেই নির্বাসনই যেন হয়ে ওঠে বিপ্লবের ভিত্তি। শাহের ধারণা ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খামেনি হারিয়ে যাবেন জনচক্ষুর আড়ালে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল সম্পূর্ণ উল্টোটা। নাজাফের এক সাধারণ ঘর থেকে ইমাম আলীর মাজারের পাশেই বসে খামেনি তার জ্বালাময়ী বক্তব্য রেকর্ড করতেন ক্যাসেট টেপে। সেই টেপ চলে যেত গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে। মসজিদ থেকে শুরু করে বাজার—সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ত এই বার্তা, এবং তা দ্রুতই রূপ নেয় এক রাজনৈতিক আগুনে।
সাদ্দাম এতে গভীর উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। ইরানের গোয়েন্দা সূত্র এবং খামেনির ঘনিষ্ঠদের মতে, সাদ্দাম তার এই প্রস্তাবটি এক গোপন কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠান শাহের কাছে। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—ইরাকে থাকা শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্রোহ সৃষ্টির আশঙ্কায় খামেনিকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু শাহ সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তার যুক্তি ছিল, তারা কোনো ধর্মীয় নেতার প্রাণ নিতে চান না। বরং ইরাককে অনুরোধ করেন খামেনিকে দেশছাড়া করতে। এই সিদ্ধান্তকে কেউ দেখেন নৈতিক অবস্থান হিসেবে, আবার কেউ বলেন শাহ নিজেকে আধুনিক ও সভ্য নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।
১৯৭৮ সালে, ইরানের রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির সময় সাদ্দাম খামেনিকে ইরাক থেকে বের করে দেন। ধারণা ছিল, এতে করে চাপ কমবে। কিন্তু ফল হয় বিপরীত। ফ্রান্সে নির্বাসিত হয়ে খামেনি পেয়ে যান গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা, সেখান থেকেই তার বিপ্লবী বার্তা আরও জোরালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে সারা ইরানে। মাত্র চার মাস পরেই শাহের সরকার পতনের মধ্য দিয়ে ইতিহাস নেয় নতুন মোড়।
এই পর্বটি প্রমাণ করে, ইতিহাস কখনোই আগেভাগে কাউকে জয়ী বা পরাজিত করে না। কেউ সুযোগ পেলেও যদি তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়, তবে পরিণতিও হতে পারে নির্মম। সাদ্দাম হোসেনের মতো।