শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৬:২২ পূর্বাহ্ন
ঘোড়ায় চড়ে ৬,৫০০ কিমি! বিশ্বাস আর ইতিহাসের সম্মিলিত জার্নি!
অনলাইন ডেস্ক
লাখো মুসলমান যখন হজের মৌসুমে উড়োজাহাজে কিংবা গাড়িতে চড়ে পবিত্র মক্কায় যাচ্ছেন, তখনই তিন স্প্যানিশ মুসলিম বেছে নিলেন এক অভিনব পথ—৬,৫০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছেন ঘোড়ায় চড়ে! সাত মাসের এই কঠিন ও শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জিং সফর শুধু হজের তাড়নায় নয়, বরং ইতিহাসের বুকে হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন রুটকে আবার জাগিয়ে তোলার প্রয়াসও ছিল।
বুধবার (৪ জুন) আমিরাতভিত্তিক গণমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’ তাদের এক প্রতিবেদনে এই অসাধারণ অভিযানের খবর প্রকাশ করে।
দক্ষিণ স্পেনের আন্দালুসিয়ার ঐতিহাসিক শহর আলমোনাস্তার লা রিয়ালের একটি পুরোনো মসজিদ চত্বর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে যাত্রা শুরু করেন আবদেলকাদির হারকাসি আইদি, তারেক রদ্রিগেজ ও আবদাল্লাহ রাফায়েল হেরনান্দেজ মানচা। শুরুতে তাদের সঙ্গে ছিলেন মোহাম্মদ মেসবাহি, তবে যাত্রার শুরুতেই ঘোড়ার অসুস্থতার কারণে তাকে ফিরতে হয়।
এই পথটি প্রায় ৫০০ বছর আগে আন্দালুসীয় মুসলিমদের ব্যবহৃত একটি ঐতিহাসিক হজরুট। ইতিহাসের শিক্ষক হেরনান্দেজ মানচা ৩৬ বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, আর এই সফর ছিল তার বিশ্বাসের প্রতি প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ।
চার বছর ধরে তারা প্রস্তুতি নিয়েছেন—ঘোড়া চালনার প্রশিক্ষণ, অর্থসংগ্রহ, শারীরিক সক্ষমতা—সবই ছিল এই স্বপ্নযাত্রার অংশ। প্রতিদিন গড়ে ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন খুজেস্তানি ঘোড়ায়। নিজেরাই রান্না করতেন, তাবুতে রাত কাটাতেন। সংকটকালে বিভিন্ন দেশের মানুষের উদারতায় ভরসা পেয়েছেন।
ফ্রান্স ও ইতালিতে তারা ইকুয়েস্ট্রিয়ান সেন্টারগুলিতে আশ্রয় পান। ইতালির ভারোনায় সৌদি ইনফ্লুয়েন্সার আবদুর রহমান আল-মুতাইরি তাদের একটি ক্যারাভান দিয়ে সহায়তা করেন। বসনিয়া, সারায়েভো, তুরস্ক—প্রতিটি দেশেই মুসলিম ভাইদের কাছ থেকে পেয়েছেন হৃদয়ছোঁয়া আতিথেয়তা। সার্বিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত শহর নোভি পাজারে পেয়েছেন ভ্রাতৃত্বের আলিঙ্গন।
তুরস্কে ঢোকার সময় তারা ফিরে পান তাদের ঘোড়া। তখনই শুরু হয় পবিত্র রমজান। রোজা রেখে পথ চলেছেন, স্থানীয়দের সঙ্গে একত্রে ইফতার করেছেন।
সিরিয়া, জেরুজালেম ও জর্ডান হয়ে তারা সৌদি আরবে প্রবেশ করেন। প্রশাসনিক জটিলতায় ঘোড়াগুলো রিয়াদে রেখে মদিনায় যেতে হয়। সৌদি সরকার তাদের জন্য ফ্লাইট ও আতিথেয়তার ব্যবস্থা করে। মদিনা থেকে অবশেষে তারা মক্কায় পৌঁছান—হজের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।
আবদেলকাদির বলেন, “এই যাত্রা ছিল একেবারে অসম্ভব; আল্লাহর কৃপা ছাড়া সম্ভব হত না। আমরা শুধু হজে আসিনি, আমরা স্প্যানিশ মুসলিমদের ইতিহাস ও পরিচয় বহন করে এনেছি।”
তবে যাত্রার সমাপ্তি ছিল কিছুটা বেদনার। ঘোড়াগুলো আর তাদের সঙ্গে ফিরবে না। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধের কারণে এগুলো সৌদিতেই রেখে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তাদের উন্নত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
এই তিন মুসলিম অভিযাত্রীর কাহিনি কেবল হজ নয়—এ এক জীবন্ত ইতিহাস, একনিষ্ঠ বিশ্বাস, আত্মত্যাগ আর মানবিক সংহতির অনবদ্য দৃষ্টান্ত।