শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৭ অপরাহ্ন
ধূমপানের কারণে ফুসফুসের ক্ষতি সম্পর্কে আমরা অনেকেই সচেতন, তবে এটি মস্তিষ্কের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা অনেকেরই জানা নেই।
সম্প্রতি ‘অ্যানিমেটেড বায়োমেডিকেল’ নামক একটি সংস্থা একটি অ্যানিমেশন ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে, মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যে সিগারেটের নিকোটিন মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় এবং তা ধূমপানের প্রতি আসক্তি তৈরি করে। এই ভিডিওটি ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
সিগারেটের ধোঁয়া শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। নিকোটিন খুব দ্রুত মস্তিষ্কে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা একজন ব্যক্তির অনুভূতি ও আচরণকে প্রভাবিত করে।
১০ সেকেন্ডের মধ্যেই নিকোটিন মস্তিষ্কের সেই অংশকে সক্রিয় করে, যা আনন্দ ও তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে। ফলে, ধূমপায়ীরা ধীরে ধীরে এ অনুভূতির প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং বারবার সিগারেট গ্রহণের প্রবণতা তৈরি হয়।
নিকোটিন মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে এবং ‘সুখ’ অনুভূতি সৃষ্টি করে। এটি এক ধরনের অস্বাভাবিক ভালো লাগার অনুভূতি সৃষ্টি করে, যা মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই আরও বেশি চাইতে থাকে।
ধীরে ধীরে নিকোটিন ছাড়া সেই সুখানুভূতি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং ব্যক্তি আরও বেশি সিগারেট খাওয়ার প্রবণতা দেখান। এভাবেই ধীরে ধীরে ধূমপানের প্রতি নির্ভরতা বাড়তে থাকে এবং তা আসক্তির রূপ নেয়।
নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করলে তা সাময়িকভাবে স্বস্তি ও আনন্দ দেয়, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে এর মাত্রা কমতে থাকে। ফলে ধূমপায়ী অস্থিরতা, বিরক্তি বা মানসিক চাপ অনুভব করেন এবং পুনরায় সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছা জাগে।
এভাবে ধূমপানের প্রতি এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, যা আসক্তির অন্যতম লক্ষণ। ধূমপায়ীরা প্রায়ই সারাদিন ধরে একাধিকবার সিগারেট গ্রহণ করেন, কারণ তাদের মস্তিষ্ক নিকোটিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
একবার সিগারেটের প্রতি নির্ভরতা তৈরি হলে তা ছাড়তে বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। যখন কেউ সিগারেট ছাড়ার চেষ্টা করেন, তখন বিষণ্নতা, বিরক্তি ও অস্থিরতার অনুভূতি দেখা দেয়।
এই কারণে অনেকেই আবার সিগারেট খেতে বাধ্য হন, কারণ এটি সাময়িক স্বস্তি এনে দেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি মস্তিষ্কের ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সিগারেট খাওয়ার প্রভাব শুধু ফুসফুসে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে ধূমপান করলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং চিন্তাশক্তির ক্ষতি হতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে ধূমপায়ীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়, যা অল্প বয়সেই মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ধূমপানের ফলে মস্তিষ্কের রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়, যা ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। নিকোটিন এবং অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক মস্তিষ্কের রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, ফলে স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, সিগারেট ছেড়ে দিলে পাঁচ বছরের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পায়।
সিগারেটে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রবেশ করে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মস্তিষ্কের কোষগুলোও এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্বারা প্রভাবিত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
সিগারেট খেলে ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে সিগারেট ত্যাগ করলে এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব এবং শরীর দ্রুত সুস্থতার দিকে ফিরে যেতে পারে।
সিগারেটের প্রতি আসক্তি থেকে দূরে থাকার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো একে একেবারে না শুরু করা। আর যদি কেউ ইতোমধ্যে ধূমপানের অভ্যাস গড়ে তোলেন, তবে দ্রুত এটি ছেড়ে দেওয়া উচিত, যাতে মস্তিষ্ক ও শরীরের ক্ষতি এড়ানো যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।