শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৩ অপরাহ্ন
শুরু হলো মহান স্বাধীনতার মাস। আমাদের জাতীয় জীবনে গৌরব, বেদনা ও অদম্য অঙ্গীকারের অনন্য অধ্যায় এই মার্চ। মাসটি এলেই বাঙালির হৃদয়ে জেগে ওঠে দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস, উত্তাল সংগ্রামের দিনগুলো এবং আত্মত্যাগে রঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যিক স্মৃতি। স্বাধীনতা আকস্মিকভাবে অর্জিত হয়নি; এর পেছনে রয়েছে রক্তস্নাত পথচলা, অবিরাম আন্দোলন এবং জাতিসত্তার স্বীকৃতির জন্য আপসহীন লড়াই।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও পূর্ববাংলার মানুষের জীবনে প্রকৃত মুক্তি আসেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়েও পূর্বাঞ্চলের বাঙালিরা শুরু থেকেই বৈষম্যের শিকার হয়। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসন, সামরিক কাঠামো ও অর্থনীতিতে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ববাংলার উৎপাদিত পাট ও কৃষিপণ্যের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো মূলত পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়নে। বিপরীতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগে পূর্বাঞ্চল ছিল অবহেলিত। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাঙালির আত্মপরিচয়ে সরাসরি আঘাত হানে। এর প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রথম সুসংগঠিত প্রতিরোধ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তী সব আন্দোলনের প্রেরণার উৎস হয়ে এটি জাতিসত্তার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন এবং ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচি বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংহত রূপ দেয়। ছয় দফা ছিল অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক বৈষম্য দূর করে পূর্ববাংলাকে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার স্পষ্ট রূপরেখা। এ দাবির প্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো দমন-পীড়ন নেমে আসে। কিন্তু বাঙালির আন্দোলন থামেনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি সামরিক শাসনের ভিত নড়িয়ে দেয়।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক নিয়মে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানা অজুহাতে তা বিলম্বিত করে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হয়, শুরু হয় রাজনৈতিক টালবাহানা। একই সময়ে ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত পূর্ববাংলার মানুষের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতা ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে। বঞ্চনা তখন বিস্ফোরণের দ্বারপ্রান্তে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ভাষণটি ছিল রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির অনন্য আহ্বান।
অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নৃশংস অভিযান শুরু করে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মাধ্যমে বাঙালির কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা চালানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, পাড়া-মহল্লা—কোথাও রক্ষা পায়নি। নিরস্ত্র মানুষের ওপর এই বর্বর ক্র্যাকডাউন বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। ২৬ মার্চের প্রভাতে স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সংগঠিত হতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা। ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্র গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। প্রবাসে গঠিত হয় অস্থায়ী সরকার এবং বিশ্বজনমত সংগঠনে শুরু হয় কূটনৈতিক তৎপরতা।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং প্রায় দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বেদনা অতিক্রম করে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে দখলদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। লাল-সবুজের পতাকা উড়ে স্বাধীন আকাশে।
স্বাধীনতার মাস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের শেকড়। এই মাস শেখায়—অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই মুক্তির পথ। স্বাধীনতা মানে শুধু ভূখণ্ডের মুক্তি নয়; এটি ন্যায়, সাম্য, গণতন্ত্র ও মানবিক মর্যাদার অঙ্গীকার।