শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৩ অপরাহ্ন
সাদিকা জাহান
রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বাড়লে প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তিত হয়ে হলুদ হয়ে যায়। ত্বক, চোখের সাদা অংশ এবং মুখের ভিতরে হলদেটে ভাব দেখা দেয়। এই অবস্থাকে সাধারণত জন্ডিস বলা হয়।
জন্ডিসের পাশাপাশি অরুচি, ক্ষুধামান্দ্য, বমি বমি ভাব, জ্বরের সাথে কাঁপুনি, মৃদু বা তীব্র পেটব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে তৎক্ষণাত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যাতে চিকিৎসক রোগীর শারীরিক লক্ষণ এবং রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে জন্ডিসের তীব্রতা ও কারণ চিহ্নিত করে উপযুক্ত চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান করতে পারেন।
জন্ডিস কী যকৃত বা পিত্তনালির সমস্যা হলে সাধারণত জন্ডিস দেখা দেয়। জন্ডিস আসলে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়, এটি একটি লক্ষণ মাত্র। রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা যদি ৩ মিলিগ্রাম বা ডেসিলিটারের বেশি হয়, তবে এটি জন্ডিসে পরিণত হয়। এর ফলে ত্বক, চোখের সাদা অংশ এবং অন্যান্য মিউকাস ঝিল্লি হলুদ হয়ে যায়। রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে নানা প্রদাহ বা লক্ষণকে জন্ডিস বলা হয়।
জন্ডিসের কারণ হেপাটাইটিস বা যকৃতের প্রদাহ, পিত্তনালির বাধা বা পিত্তরসের প্রবাহের বাধা, অথবা হিমোলাইসিস, অর্থাৎ অতিরিক্ত রক্তের লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়ার কারণে জন্ডিস হয়ে থাকে।
বিভিন্ন ভাইরাস হেপাটাইটিসের অন্যতম কারণ। খাদ্য বা পানির মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাস ছড়ায়, আর ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ ভাইরাস দূষিত রক্ত, সিরিঞ্জ এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়।
জন্ডিসের প্রকারভেদ জন্ডিসের প্রধান কারণ যকৃতের রোগ। আমাদের শরীরের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য লিভারের মাধ্যমে হয়ে থাকে। লিভারের বিভিন্ন রোগের কারণে জন্ডিস হতে পারে। হেপাটাইটিস ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ এবং ‘ই’ ভাইরাসগুলো লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যাকে ভাইরাল হেপাটাইটিস বলা হয়। এই ভাইরাসগুলো জন্ডিসের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে, তবে উন্নত দেশে অতিরিক্ত মদ্যপানও একটি প্রধান কারণ।
জন্ডিস হয়েছে বুঝবেন যেভাবে জন্ডিসের সাধারণ লক্ষণ হলো চোখ ও প্রস্রাবের রং হলুদ হয়ে যাওয়া। হেপাটাইটিসের সঙ্গে ক্ষুধামান্দ্য, অরুচি, অবসাদ, বমি ভাব, জ্বর বা কাঁপানি সহ জ্বর, মৃদু বা তীব্র পেটব্যথা হতে পারে। কখনও কখনও চুলকানিও হতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ এবং লিভারের এনজাইম পরীক্ষা করে জন্ডিস শনাক্ত করা যায়। বিলিরুবিনের মাত্রা বাড়লে লিভার প্রদাহ, পিত্তনালির প্রদাহ, পিত্তনালির ব্লক, গিলবার্ট’স সিনড্রোম, ডুবিন-জনসন সিনড্রোম দেখা দিতে পারে। জন্ডিসের কারণ জানার জন্য ভাইরাস পরীক্ষা করানো উচিত।
জন্ডিস নিয়ে ভুল ধারণা গ্রামাঞ্চলে মেটে জন্ডিস নামে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। সাধারণত খাওয়ায় অরুচি হলে সেটিকে জন্ডিস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সময়ে ঝাড়ফুঁক বা তাবিজ-কবজ নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা আসলে ভুল ধারণা। চিকিৎসকরা বলছেন, মেটে জন্ডিস নামে কোনো কিছুই নেই।
জন্ডিসে করণীয় জন্ডিসের চিকিৎসা সাধারণত কারণের ওপর নির্ভর করে। তবে, জন্ডিসের প্রতিরোধে কিছু সতর্কতা মেনে চলা উচিত।
নেশাদ্রব্য থেকে দূরে থাকুন।
কলকারখানার রাসায়নিক পদার্থ থেকে সাবধান থাকুন।
ব্যবহৃত ইনজেকশন বা সুই ব্যবহার করবেন না। সেলুনে সেভ করার সময় সাবধান থাকুন যেন পুরোনো ব্লেড বা ক্ষুর পুনরায় ব্যবহৃত না হয়।
নিরাপদ যৌন সম্পর্ক বজায় রাখুন।
হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘বি’ থেকে রক্ষা পেতে হেপাটাইটিসের ভ্যাকসিন নিন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। বিশ্রাম না নিলে যকৃতের ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং বিলিরুবিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। শোয়া অবস্থায় থাকতে হলে তা সহায়ক হতে পারে।
স্বাভাবিক খাবার খান। অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন নেই। পুষ্টিকর, রুচিকর খাবার গ্রহণ করতে পারেন।
স্বাভাবিক মাত্রায় পানি পান করুন। অতিরিক্ত পানি, আখের রস বা জুস খেলে জন্ডিসে উপকার হয় এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
প্রতিদিন গোসল করুন। শুদ্ধ থাকতে হবে কারণ যকৃতের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ সময়ে যেকোনো ধরনের অযথা ওষুধ গ্রহণ না করাই ভালো। পেটব্যথা বা বমির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ নিতে পারেন, তবে উচ্চ রক্তচাপের জন্য প্রেসক্রাইব করা ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে।
জন্ডিসে যা করতে মানা কোনো ধরনের কবিরাজি, গাছের লতা বা রস গ্রহণ করা উচিত নয়। এতে যকৃতের প্রদাহ আরও বাড়তে পারে।
লিভার টনিক, সালসা সিরাপ, পড়া পানি, জন্ডিস সারানোর তরল বিক্রয় করা হয়, যা শরীরের ক্ষতি করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্রামেই জন্ডিস সেরে যায়, তাই এসব অপচিকিৎসা থেকে বিরত থাকুন।
অনেকে মনে করেন জন্ডিস হলে হলুদ বা মসলাযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না। এটি একটি ভুল ধারণা। খাবারের রুচি বাড়াতে সাধারণ মসলা বা তেল ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে ভারী বা ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলুন।
এমন কিছু মানুষ আছেন যারা শুধু তরল খাবার যেমন আখের রস বা চিনির শরবত খেয়ে থাকেন, কিন্তু এতে পুষ্টিহীনতা হতে পারে। সুষম খাবার গ্রহণ জরুরি।
এটা যে ধারণা রয়েছে যে জন্ডিস হলে প্রতিদিন গোসল করলে শরীরের হলুদ কমে যাবে, তা একেবারেই ভিত্তিহীন। অধিক গোসল ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কখন হাসপাতালে যাওয়া উচিত প্রতিটি জন্ডিস রোগী বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবারে সেরে ওঠে, তবে কখনও কখনও আরো কিছু সময় প্রয়োজন হয়। যদি জন্ডিসের জটিলতা দেখা দেয়, তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি। যদি বিলিরুবিনের পরিমাণ অত্যাধিক বাড়ে, রোগী কিছু খেতে না পারেন বা অতিরিক্ত বমি হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে হাসপাতালে নিতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে, গর্ভবতী রোগী বা অসংলগ্ন আচরণ করা রোগীকে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।