মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৪ অপরাহ্ন
প্রকৃতির নিয়মে ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় আকাশের রূপও। বাংলাদেশে তীব্র গরমের পরপরই দেখা দেয় কালবৈশাখীর দাপট। এই ঝড় যতটা দৃষ্টিনন্দন, ততটাই ভীতিকর এর অন্যতম উপাদান বজ্রপাত, যা প্রতি বছর বহু প্রাণ কেড়ে নেয়।
প্রতিবছর বজ্রপাতে দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটে। জীবনযাত্রা বিষয়ক এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো কোন সময়ে বজ্রপাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে এবং কীভাবে নিরাপদ থাকা সম্ভব।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মোট বজ্রপাতের প্রায় ৩৮ শতাংশ ঘটে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। এর মধ্যে বৈশাখ মাসে, অর্থাৎ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এছাড়া বছরের বাকি ৫১ শতাংশ বজ্রপাত হয় জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে, যেগুলোকে সাধারণ বজ্রঝড় হিসেবে ধরা হয়।
অঞ্চলভেদে বজ্রপাতের সময়েও কিছু পার্থক্য দেখা যায়। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে সাধারণত বিকেলের শেষভাগ বা সন্ধ্যায় কালবৈশাখী হয়, আর পূর্বাঞ্চলে তা কিছুটা দেরিতে, অর্থাৎ সন্ধ্যার পর দেখা যায়। আকাশে কালো মেঘ বা বজ্রমেঘ দেখা গেলে সাধারণত ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যেই ঝড় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা জায়গায় অবস্থান করাই বজ্রপাতে মৃত্যুর প্রধান কারণ। বিশেষ করে কৃষক, জেলে ও মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ ঝড়ের সময় বাইরে থাকায় বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব ও সচেতনতার ঘাটতিও এ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বজ্রপাত থেকে সুরক্ষিত থাকতে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে—
১. বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতরে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ। ঝড়ের আভাস পেলেই দ্রুত পাকা দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন। ছাদ বা উঁচু জায়গা এড়িয়ে চলুন।
২. ঘরে থাকলে জানালার পাশে বা বারান্দায় দাঁড়াবেন না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকুন।
৩. গাড়িতে থাকলে ধাতব অংশ স্পর্শ করবেন না এবং সম্ভব হলে নিরাপদ ছাউনির নিচে গাড়ি রাখুন।
৪. ঝড় চলাকালে মোবাইল, ল্যাপটপ, টিভি, ফ্রিজসহ সব ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার বন্ধ রাখুন।
৫. বড় গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার বা মোবাইল টাওয়ার থেকে দূরে অবস্থান করুন।
৬. ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করুন এবং বাইরে গেলে রাবারের জুতা পরুন।
৭. খোলা মাঠে থাকলে আশ্রয় না পেলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নিচু হয়ে বসুন এবং কানে আঙুল দিন। তবে কখনোই মাটিতে শুয়ে পড়বেন না।
৮. বজ্রপাতের সময় নৌকায় মাছ ধরতে যাওয়া উচিত নয়। নৌকায় থাকলে দ্রুত ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন।
৯. বাড়ির ধাতব কল, রেলিং বা পাইপ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।
১০. পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকলে একসঙ্গে না থেকে আলাদা কক্ষে অবস্থান করুন।
১১. কেউ আহত হলে দ্রুত চিকিৎসা দিন এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে নিন। শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক করতে চেষ্টা চালিয়ে যান।
১২. খোলা স্থানে একাধিক ব্যক্তি থাকলে বজ্রপাত শুরু হলে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন।
প্রকৃতির এই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তবে সচেতনতা ও সতর্কতাই পারে জীবন রক্ষা করতে। তাই বজ্রপাতের সময় সামান্য অসতর্কতাও বড় বিপদের কারণ হতে পারে—সতর্ক থাকুন, নিরাপদ থাকুন।