সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৪:০৮ পূর্বাহ্ন
‘মেয়েডা মারা গেছে এক বছরের বেশি হইছে। বিচারে আসামির ফাঁসি হইছে, সেটাও প্রায় এক বছর আগে। কিন্তু এখনো অপেক্ষা করছি, কবে আমার আছিয়ার খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হবে। আমার স্বামী মানসিক ভারসাম্য হারাইছে। তাকে সামলাই, নাকি বিচারের জন্য আদালতের পেছনে ঘুরি!’—বুকভরা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা মামলার বাদী আয়েশা খাতুন।
বিচারিক আদালতে রায় ঘোষণার এক বছর পার হলেও এখনো কার্যকর হয়নি মৃত্যুদণ্ড। মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হলেও উচ্চ আদালতের আপিল প্রক্রিয়ায় থমকে আছে বিচার কার্যক্রম।
বুধবার দুপুরে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে আছিয়াদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ছাউনি ও বেড়া দিয়ে তৈরি ছোট্ট ঘরে এখনো শোকের ছাপ স্পষ্ট। ঘরের এক কোণেই থাকত তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আছিয়া।
সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি আছিয়ার মা আয়েশা খাতুন। পরে অনুরোধে বারান্দায় বসে তিনি বলেন, ‘অনেকেই তখন এসেছিল, অনেক প্রতিশ্রুতি দিছিল। কিন্তু এই এক বছরে কেউ আর খোঁজ নেয়নি। আমরা কেমন আছি, কীভাবে চলছি—কেউ জানতে চায় না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা অপেক্ষা করছি আছিয়ার হত্যাকারীর ফাঁসি কবে হবে। আর আসামি জেলে বসে সরকারি খাবার খাচ্ছে। একজন মায়ের পক্ষে এটা সহ্য করা খুব কঠিন।’
আয়েশা খাতুন জানান, একটি সংগঠন তাদের একটি গাভি দিয়েছিল। বর্তমানে সেই গাভির দুধ বিক্রি করেই কোনোভাবে সংসার চলছে।
তিনি বলেন, ‘যা পাই তাই খাইয়া বাঁচি। সরকারের অনেক চাল-ডাল আছে, হিটু শেখরে খাওয়াক।’
মামলার অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে আয়েশা বলেন, ‘এতদিনেও রায় কার্যকর হলো না কেন বুঝতে পারি না। তার ফাঁসি দেখতে আমাদের আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে জানি না। তার দুই ছেলে তো খালাস পাইছে। আমার ভয় হয়, বেশি দেরি হলে হিটু শেখও খালাস পেয়ে যাবে।’
আছিয়ার বড় বোন ফাতেমা বর্তমানে নতুন সংসারে রয়েছেন। ২০২৫ সালের ৫ মার্চ রাতে পুরনো শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় আট বছরের আছিয়া। পরে অচেতন অবস্থায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ঢাকার সিএমএইচে মারা যায় শিশুটি।
ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরে নারী নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন এনে দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও এরপর মামলার আর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
আয়েশা খাতুন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আছিয়ারে হত্যার পর মেয়ে ফাতেমারে বাড়িতে নিয়ে আসি। স্বামীরে তালাক দেওয়াই। কিন্তু অভাবের কারণে পরে আবার বিয়ে দিতে হইছে। নিজেদেরই ঠিকমতো খাওয়া জোটে না, মেয়েরে কীভাবে রাখতাম?’
অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হিটু শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘটনার পর ভাঙচুর হওয়া বাড়ির জায়গায় পলিথিন, পুরনো টিন ও সিমেন্টের বস্তা দিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয়েছে। সেখানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করছেন হিটু শেখের মা রোকেয়া বেগম।
তিনি বলেন, ‘বাড়িঘর ভাঙার পর কষ্ট করে থাকতেছি। রাতুল আর সজিব নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালায়।’
রোকেয়া বেগম দাবি করেন, তার ছেলে নির্দোষ। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে এমন কাজ করতে পারে না।’
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম মুকুল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হিটু শেখের পক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুত শুনানি শেষ হয়ে ফাঁসির রায় কার্যকর হবে।’
হিটু শেখের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ নিয়োজিত আইনজীবী সোহেল আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে আপিল কার্যক্রম ঢাকায় চলছে। সবশেষ শুনানি হয়েছিল গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর। এরপরের বিষয়ে আমার কাছে নতুন তথ্য নেই।’
মাগুরা জেলা গণকমিটির সদস্যসচিব প্রকৌশলী শস্পা বসু বলেন, ‘আছিয়ার মতো নির্মম ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় এখনো কার্যকর না হওয়ায় আমরা ক্ষুব্ধ। বিচার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ বাড়িয়ে দেয়। শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। আমরা চাই দ্রুত রায় কার্যকর হোক।’
সূত্র: কালের কন্ঠ