শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৪১ অপরাহ্ন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “জামায়াতে ইসলামী যদি দেশ পরিচালনার সুযোগ পায়, তবে চাঁদাবাজি ও দখলদারের কোনো স্থান থাকবে না। ঘুষ নামের ক্যানসার সমাজ থেকে নির্মূল হবে। আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই, যা ফ্যাসিবাদ বা সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবমুক্ত থাকবে।”
শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) সকালে যশোর ঈদগাহ ময়দানে জেলা জামায়াতের এক বৃহৎ কর্মী সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জনগণ এমন এক সমাজব্যবস্থা প্রত্যাশা করছে যেখানে কোনো চাঁদাবাজি বা দুঃশাসন থাকবে না। জামায়াতের লক্ষ্য একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। ক্ষমতার মোহ নয়, আমরা জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন চাই, যাতে সত্যিকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।”
তিনি আরও বলেন, “গত ১৫ বছরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। জামায়াতে ইসলামীর চিন্তাধারায় শিক্ষাব্যবস্থা এমন হবে যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল সার্টিফিকেট নিয়ে নয়, চাকরির নিশ্চয়তা নিয়েও বের হবে।”
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জাতিকে আর কত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে বিভাজনের চেতনায় বিভ্রান্ত করবেন? ৫৩ বছর ধরে এই জাতিকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছেন। আমরা আর কারও দাস হব না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১৬ ডিসেম্বরের মন্তব্য আমাদের আত্মসম্মানে আঘাত করেছে, যা আমরা মেনে নিতে পারি না।”
তিনি বলেন, “৫ আগস্টের আগে দেশ ছিল দুঃশাসনের আধার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশে দুঃশাসন, জুলুম বৃদ্ধি পায়। গত সাড়ে ১৫ বছরে তাদের শাসনে জনগণ দুঃখ-কষ্টে ছিল। তবে ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক অর্জন প্রমাণ করেছে যে ফ্যাসিস্ট শাসন চিরস্থায়ী হতে পারে না। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তাদের গৌরব আমাদের জাতীয় সম্পদ।”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “যশোর ব্রিটিশ আমলের অন্যতম পুরাতন জেলা হলেও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। এই জেলাকে দেশের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পার্ক, খেলার মাঠ এবং জলাধারের অভাব এই শহরের জন্য এক বড় সমস্যা। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়ে নেতারা পাঁচ বছর জনগণকে ভুলে যায়। আমরা এই ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই।”
তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা ব্যাংক লুট করে অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। বড় বড় চোর-ডাকাতরা ব্যাংকগুলোকে ধ্বংস করেছে। এখন ব্যাংকগুলোর অবস্থা এমন যে ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে সচল করার চেষ্টা করছে, কিন্তু বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙার পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, “চাঁদাবাজি ও দখলদারি করার জন্য শহীদরা জীবন উৎসর্গ করেননি। এ ধরনের ঘৃণিত কাজে লিপ্ত হওয়া শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করার শামিল। ফুটপাত, হাটঘাট, বালুমহাল কিংবা জলমহাল দখল করা থেকে নিজেদের বিরত রাখুন।”
মিথ্যা মামলা ও হয়রানির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একটি হত্যাকাণ্ডের মামলায় ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করা কতটা যুক্তিসঙ্গত? মিথ্যা মামলা দিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
দেশে সব মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এ দেশে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু বলে কোনো ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। সংবিধান অনুযায়ী সবাই সমান অধিকার ভোগ করে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে বসবাস করে। যদি কেউ সংখ্যালঘু বলে ছোট করে, আপনারা বলুন, আমরা রাষ্ট্রের নাগরিক এবং আমাদের অধিকার সমান।”
তিনি বলেন, “সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার নামে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন করেছে। ২০১৩ সালে জাতিসংঘে আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছিলাম এবং আজও বলছি, নিরপেক্ষ তদন্ত করুন। যদি আমাদের দোষ প্রমাণিত হয়, আমরা নিজেরাই শাস্তি দাবি করব।”
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন যশোর জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল। এ সময় আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মোবারক হোসেন, মুহাদ্দিস আবদুল খালেক, মাওলানা আজিজুর রহমান, ঝিনাইদহ জেলা আমির অধ্যাপক আলী আযম, সাতক্ষীরা জেলা আমির শহিদুল ইসলাম মুকুল, মাগুরা জেলা আমির এমবি বাকের, নড়াইল জেলা আমির আতাউর রহমান বাচ্চু, শহীদ আবদুল্লাহর বাবা আবদুল জব্বার এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।