সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:২৯ অপরাহ্ন
মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যেই ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর ভাষানটেক এলাকার বিআরবি মাঠে ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এই আহ্বান জানান।
সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, আমরা সবাই দেখেছি গত ১৫/১৬ বছরে দেশে কী ঘটেছে। চব্বিশের ৫ আগস্ট দেশে একটি পরিবর্তন এসেছে। আমার বিশ্বাস, সারা দেশের মানুষ একটি পরিবর্তন চায়, ভালো পরিবর্তন চায়। মানুষ চায় তাদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান হোক। মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান, দেশে যে বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণ-তরুণী আছে, যারা দীর্ঘদিন কর্মহীন অবস্থায় আছে, তাদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি—এই সবকিছুর সমাধান মানুষ প্রত্যাশা করে।
তিনি বলেন, অতীতের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই এই জনগণের পাশে কারা এসে দাঁড়িয়েছে। কাজেই আমরা যদি অতীতের সব কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করি, তাহলে স্পষ্ট হবে—এই দেশের মানুষ যতবার ধানের শীষকে নির্বাচিত করেছে, ততবারই দেশে উন্নয়ন হয়েছে, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে, ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আজ আমি ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে আপনাদের কাছে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইতে এসেছি।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার পর ঢাকা-১৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে এটিই তারেক রহমানের প্রথম নির্বাচনী সমাবেশ। এর আগে বুধবার রাতে তিনি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহ পরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। এরপর বৃহস্পতিবার সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে এক সমাবেশের মাধ্যমে তিনি দলের নির্বাচনী প্রচারণার সূচনা করেন।
ভাষানটেকের এই নির্বাচনী সমাবেশে তারেক রহমান তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হন। এলাকার মানুষের প্রকৃত সমস্যাগুলো জানার উদ্দেশ্যে তিনি সমাবেশস্থলেই নিজ হাতে মাইক তুলে নেন। এরপর ভাষানটেকের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা, তরুণ শিক্ষার্থী, প্রান্তিক শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী ও পুরুষকে একে একে সামনে ডেকে এনে তাদের কাছ থেকে এলাকার সমস্যাগুলোর কথা শোনেন। তারা জানান, ভাষানটেকের বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন জরুরি, নারীদের জন্য কর্মসংস্থান প্রয়োজন, ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তারা চান।
এর জবাবে তারেক রহমান বলেন, আমিও এই এলাকায় প্রায় ৫০ বছর ধরে বড় হয়েছি। যদিও জীবনের একটি সময় আমাকে এখান থেকে অনেকদিন বাইরে থাকতে হয়েছে, তবুও আমি আপনাদেরই একজন। স্বাভাবিকভাবেই আজ যখন আমি এই এলাকার প্রার্থী হয়েছি, তখন আপনাদের কাছে এটুকু বলতে পারি—ইনশাআল্লাহ আপনাদের দোয়া ও আল্লাহর রহমতে আগামী নির্বাচনে আমি জয়ী হলে এবং ধানের শীষ সরকার গঠনে সক্ষম হলে, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনসহ এখানে উত্থাপিত অন্যান্য সমস্যার সমাধানে আমরা কার্যকর উদ্যোগ নেব।
বিএনপি ক্রীড়াবান্ধব দল উল্লেখ করে মঞ্চে উপস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হকের দিকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, এখানে আমিনুল হক উপস্থিত আছেন, যাকে সবাই চেনেন। ছেলে হোক বা মেয়ে—যেন তারা প্রফেশনাল খেলোয়াড় হতে পারে, খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নিয়ে জীবিকা অর্জন করতে পারে, সেই প্রতিভাগুলোকে আমরা খুঁজে বের করে সামনে আনতে চাই।
তিনি আরও বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে। কিন্তু বিগত ১৫/১৬ বছরে দেশের প্রতিটি সেক্টর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ধ্বংসের কারণে আজ দেশ অনেক পিছিয়ে পড়েছে। এখন আমাদের সেসব খাত পুনর্গঠন করতে হবে। আর পুনর্গঠন করতে হলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আপনারা যদি আপনাদের প্রতিনিধি নিজেরা নির্বাচন করতে পারেন, তাহলেই আপনার এলাকার সমস্যাগুলো সরাসরি তার কাছে তুলে ধরতে পারবেন। আমি কি ঠিক কথাই বলছি?
ঢাকা-১৭ আসনের ধানের শীষের এই প্রার্থী বলেন, বিগত ১৫ বছরে যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেসব নির্বাচনে যে তথাকথিত এমপিরা ছিলেন, আপনারা কি কখনো তাদের কাছে যেতে পেরেছেন? এলাকার সমস্যার কথা বলতে পেরেছেন? পারেননি। তাই যদি এলাকার সমস্যার সমাধান করতে হয়, যদি দেশের উন্নয়ন করতে হয়, তাহলে অবশ্যই গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে। বিষয়টি শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় সংসদের মতো পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ—সব স্তরেই জনপ্রতিনিধি নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। জনগণ কী চায়, জনগণের সমস্যা কী—জনপ্রতিনিধিদের তা জানতেই হবে।
তিনি বলেন, আজ যেভাবে আমি আপনাদের কাছে এসে সরাসরি আপনাদের সমস্যার কথা শুনেছি, আগামী দিনে বাংলাদেশের প্রতিটি স্তরে যারা জনপ্রতিনিধি হবেন, তাদেরও এভাবেই জনগণের কাছে যেতে হবে। সরাসরি প্রশ্ন করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং সেগুলোর সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
জনসমস্যা সমাধানে জনপ্রতিনিধির গুরুত্ব তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমাদের যদি এই এলাকার মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে হয়, একই সঙ্গে সারা দেশের সামগ্রিক সমস্যাগুলো—মানুষের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা—পর্যায়ক্রমে সমাধান করতে হয়, তাহলে বাংলাদেশে অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক এবং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারই জনগণের সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে একটি শপথ বাক্য পাঠ করি—‘করব কাজ করব, সবার আগে বাংলাদেশ’। একই সঙ্গে আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, আজ যে পরিকল্পনাগুলোর কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে সারা বাংলাদেশে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে হবে। এজন্য আপনার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে, সবাইকে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। আপনাদের প্রার্থী হিসেবে, আপনাদের এলাকার সন্তান হিসেবে আমার বিনীত অনুরোধ—আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা যেন ধানের শীষকে নির্বাচিত করেন।
ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আবদুস সালাম এবং প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের যৌথ সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য নাজিম উদ্দিন আলম, জাগপার একাংশের সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমানসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশে উপস্থিত মানুষের অংশগ্রহণ ও স্লোগানে পুরো মাঠ ছিল উৎসবমুখর ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় পরিবেশে দিনভর নিরাপত্তা ছিল জোরদার