শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন
ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন, সংক্ষেপে ইন্টারপোল। পুলিশ না হয়েও পুলিশের চেয়ে শক্তিশালী যারা। তাদের ওয়ান্টেড লিস্টে নাম উঠলে কঠিন হয়ে পড়ে পালানো। ইউরোপ, আমেরিকা এবং বিশ্বের ১৯৫টি দেশে বিস্তৃত তাদের কার্যক্রম। এই সংস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক পুলিশকে সহায়তা প্রদান করা। সহজভাবে বললে, যখন কোন দেশের নাগরিক অপরাধ করে পালিয়ে অন্য দেশে চলে যায়, তখনই ইন্টারপোলের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। এর মানে হলো, অপরাধ করে দেশ ছাড়লেও শাস্তির হাত থেকে রেহাই নেই, কারণ ইন্টারপোল রয়েছে। বিদেশে পালিয়ে থাকা অপরাধীদের ধরতে ইন্টারপোল পুলিশ কীভাবে কাজ করে? আজকের প্রতিবেদনে থাকছে তার বিস্তারিত আলোচনা।
বড় ধরনের অপরাধ করেও এক সময় পার পেয়ে যাওয়া ছিল অনেকটা সহজ। অপরাধীরা দেশের সীমানা পার হলেই তাদের আর গ্রেপ্তার বা আটক করা সম্ভব হতো না। এই সুযোগ বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছিল বিভিন্ন মাফিয়া চক্র। বৈশ্বিকভাবে এই সমস্যা সমাধানে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৪ সালে মোনাকোতে ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ জুডিশিয়াল পুলিশের প্রথম বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈশ্বিকভাবে অপরাধীদের মোকাবেলা করার জন্য বৈঠকে একমত হন অংশগ্রহণকারী দেশগুলো। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধীদের দমন করতে হবে আন্তর্জাতিকভাবেই।’
১৯২৩ সালে, ১৯টি দেশের প্রতিনিধির নিয়ে ভিয়েনায় ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ কমিশন কার্যক্রম শুরু করে। পরে ১৯৪৬ সালে এই সংস্থার নামকরণ হয় ইন্টারপোল। এটি জাতিসংঘের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংস্থা। ফ্রান্সের লিয়নে এর সদর দপ্তর অবস্থিত। ইন্টারপোল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তদন্তের সহায়তা, দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করে।
এটি কীভাবে কাজ করে? ইন্টারপোল সারা বিশ্বের পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গঠন করেছে। যদিও এটি পুলিশ বাহিনীর মতো মনে হলেও এটি কোন পুলিশি সংস্থা নয়। এর প্রধান কাজ হলো অপরাধীদের ধরতে পুলিশকে সহায়তা প্রদান। অপরাধের পর, এক দেশের নাগরিক যখন অন্য দেশে পালিয়ে যায়, তখন তাকে ধরতে ইন্টারপোলের সাহায্য প্রয়োজন হয়। এই প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন মাফিয়া, খুনি, যুদ্ধাপরাধী বা পালানো আসামিদের বিরুদ্ধে একত্রে কাজ করে বিশ্বের সব পুলিশ বাহিনী। অপরাধের তদন্ত, ফরেন্সিক ডেটা বিশ্লেষণ এবং পলাতকদের খুঁজে বের করা, এই সব ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করে ইন্টারপোল। জঙ্গিবাদ, যুদ্ধাপরাধ, মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, শিশু পর্নোগ্রাফি, দুর্নীতি সহ মোট ১৭ ধরনের অপরাধ তদন্তে ইন্টারপোল সদস্য দেশগুলিকে সহায়তা করে।
যেভাবে আসামি ফেরত আনা হয়, সংশ্লিষ্ট দেশকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে রেড নোটিশ জারির জন্য আবেদন করতে হয়। রেড নোটিশ ছাড়াও ইন্টারপোলের ৭টি ধরনের সমন রয়েছে। রেড নোটিশকে ইন্টারপোলের আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সমতুল্য হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ব্যবস্থায় অপরাধীর অপরাধ, অবস্থান এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্রের পুলিশদের কাছে পৌঁছে যায়। ইন্টারপোল, ব্যক্তি বা আসামিকে আটক করতে রেড নোটিশ জারি করে, যাতে তারা সমর্পণ বা প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। তবে ইন্টারপোল ‘রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা জাতিগত’ বিষয় নিয়ে কাজ করে না।
বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে ইন্টারপোলের সদস্যপদ গ্রহণ করে। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের তথ্য ইন্টারপোলের কাছে পাঠানো এবং তাদের তদারকির দায়িত্ব ঢাকার পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)-এর। বর্তমানে, ইন্টারপোলের হালনাগাদ তালিকা অনুসারে ১৯৫টি সদস্য দেশের ৬ হাজার ৬৬৯ জন অপরাধীর নাম রয়েছে রেড নোটিশ বোর্ডে, যার মধ্যে ৬৪ জন বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে সবশেষ আরাভ খানকে ফেরত আনতে তৎপরতা শুরু হয়েছে, কিন্তু এখনো তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে, ইন্টারপোলের কার্যক্রম নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কিছু প্রশ্ন রয়েছে। তবে বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৫ জন পলাতককে রেড নোটিশের মাধ্যমে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।
সম্প্রতি, শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতকদের ফেরাতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।