মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৭ পূর্বাহ্ন
এক সময় সরকারের দেওয়া অনুদানে নির্মিত সিনেমাগুলো হতো কালজয়ী; কিন্তু সময়ের ধারায় সেই ঐতিহ্য এখন আর দেখা যায় না। বর্তমানে সরকারি অনুদানে তৈরি অনেক সিনেমা কালের স্রোতে হারিয়ে যায়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুদানপ্রাপ্তিতে স্বজনপ্রীতি, কম অর্থ বরাদ্দ, এবং অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের অনুদান দেওয়ার কারণে এই সিনেমাগুলো দর্শকদের মনের গভীরে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকের মত, এতে জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে। কেউ কেউ চান, এই ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হোক, আবার কেউ কেউ চাচ্ছেন পুরো ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার কথা।
অর্থ সংকটে থাকা প্রতিভাবান নতুন নির্মাতাদের উৎসাহিত করতেই ১৯৭৬ সালে সরকার এই অনুদান ব্যবস্থা চালু করে। এই অনুদানেই তৈরি হয়েছিল ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’, ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’, ‘দীপু নাম্বার টু’ সহ বহু ক্লাসিক সিনেমা। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে আবারও প্রতিবছর সিনেমা নির্মাণে অনুদান দেওয়ার প্রথা শুরু হয়। তবে বর্তমানে অনুদান নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই।
এই বছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০টি সিনেমাকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি সিনেমার জন্য ৭৫ লাখ টাকা এবং ৪টি সিনেমার জন্য ৫০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এত কম বাজেটে এই সিনেমাগুলো শেষ করা আদৌ সম্ভব কি না, সেটি নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিধান অনুযায়ী, অনুদান পাওয়ার ৯ মাসের মধ্যে সিনেমা জমা দেওয়ার কথা তথ্য মন্ত্রণালয়ে। তবে কোনো কারণে নির্মাণে দেরি হলে, যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে সময় বাড়ানো যায়। অনেক নির্মাতা এই নিয়ম ব্যবহার করে বছরের পর বছর সিনেমা ঝুলিয়ে রাখেন। এরকম অনেক নির্মাতা ও প্রযোজক রয়েছেন। আর যারা সিনেমা জমা দেন এবং মুক্তি দেন, সেগুলোর দর্শকপ্রিয়তা তেমন অর্জন করতে পারে না। এ ধরনের সিনেমার সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে রয়েছে অপু বিশ্বাসের ‘লাল শাড়ি’, অরুণা বিশ্বাসের ‘অসম্ভব’, রোজিনার ‘ফিরে দেখা’ ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এমন সিনেমাগুলো কীভাবে অনুদান পায়?
কিছু নির্মাতার মতে, বর্তমান বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সিনেমা নির্মাণ করা যায় না। অনুদান প্রাপ্ত জসিম উদ্দিনের প্রযোজনায় সিনেমা নির্মাণকারী বদিউল আলম খোকন বলেন, ‘আমি “দায়মুক্তি” নামে একটি সিনেমা নির্মাণ করেছি। প্রয়োজনীয় বাজেটের তুলনায় অনুদানের অর্থ যথেষ্ট ছিল না।’
বদিউল আলম খোকন মনে করেন, অনুদানের ক্ষেত্রে গল্পের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে সিনেমার গল্পটা বিবেচনা করা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের নামে অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো আসলেই কতটা সফল হয়েছে, সেটা দেখা প্রয়োজন। বাজেটও এত কম রাখা ঠিক নয়; প্রয়োজনীয় বাজেট বৃদ্ধি করা উচিত।’
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অধ্যাপক মতিন রহমানের মতে, ‘অনুদান নীতিমালা একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল। তবে এই পদ্ধতিটি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে, তার বিকল্পও তুলে ধরতে হবে। এই বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্ত লাগবে, তাই আপাতত এ নিয়ে বিতর্ক করে লাভ নেই। তবে আমাদের প্রয়োজন, অনুদানপ্রাপ্ত নির্মাতারা যেন সিনেমা নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেন।’
অনুদান ব্যবস্থায় সংস্কার আনার কথা অনেকেই বলেছেন। বদিউল আলম খোকনের মতে, ‘অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে সমসাময়িক এবং সচেতনতামূলক গল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সাধারণ দর্শকদের বিনোদনের জন্য তৈরি সিনেমাগুলোকেও অনুদানের আওতায় আনা দরকার। তিনি বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমার জন্য ৭০ শতাংশ এবং শিল্পমূলক ঘরানার সিনেমার জন্য ৩০ শতাংশ অনুদান বরাদ্দের প্রস্তাব করেন।’
অনুদানের বিষয়ে তরুণ মেধাবী নির্মাতাদের অভিযোগও কম নয়। নির্মাতা রিয়াজুল রিজু জানান, ‘প্রথম সিনেমা নিজের অর্থেই বানিয়েছিলাম, যা দর্শকপ্রিয়তা পায় এবং জাতীয় পুরস্কারও অর্জন করে। তবে অর্থাভাবে সরকারি অনুদানের জন্য আবেদন করেছিলাম, কিন্তু বারবার আবেদন করেও অনুদান পাইনি।’
চলচ্চিত্রের উন্নয়নবিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ আল মামুন মনে করেন, অনুদানে বড় পরিবর্তন আনা দরকার। তিনি বলেন, ‘স্বজনপ্রীতি ও অবহেলা দূর করতে অনুদান প্রক্রিয়াকে ঢেলে সাজানো উচিত, যাতে নতুন নির্মাতারা সুযোগ পান। একে আর আগের মতো রাখা ঠিক হবে না।’
তরুণ নির্মাতা যুবরাজ শামীমের মতে, ‘বর্তমানে অনুদান ব্যবস্থা যেন একক অর্থ সহায়তার মতো। সরকারের উচিত শুধু অর্থ প্রদান করেই দায়িত্ব শেষ না করে পুরো প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকা। সিনেমার প্রযোজক হয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তদারকি করা এবং এর বিপণনের ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন।’
তবে কিছু নির্মাতা অনুদান ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। বাংলাদেশ পরিচালক সমিতির সভাপতি কাজী হায়াত বলেন, ‘সরকারি অনুদানে নির্মিত সিনেমাগুলো দর্শক দেখেন না। এগুলোর সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই; বরং জনগণের অর্থের অপচয় রোধে অনুদান প্রথা তুলে দেওয়া উচিত। পরবর্তী সরকার আসলে তারা যেন এই ব্যবস্থা বন্ধ করে।’