শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:২৪ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে একটি পোস্ট করার পর থেকেই সঙ্গীতশিল্পী লগ্নজিতা চক্রবর্তী নানা কটাক্ষের শিকার হয়েছেন। ফেসবুকে ওই পোস্টটি করার পর শুরু হয় ট্রোলিং এবং সমালোচনা। এর পর তিনি আরও কয়েকটি পোস্ট করেন, কিন্তু বুঝতে পারেন যে আলোচনা থামানো সম্ভব নয়। পরবর্তীতে পরিবারের এবং ব্যান্ডের সদস্যদের অনুরোধে তিনি সব পোস্ট মুছে দেন। এই ঘটনায় গায়িকা তার মনের অবস্থা ব্যক্ত করে বলেন,
“আমি অবাক হচ্ছি, মানুষের মধ্যে কতটা ঘৃণা জমে রয়েছে! শনিবার রাতে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে একটি পোস্ট করার পর থেকেই ট্রোলিং শুরু হয়ে যায়। পরে রোববার আরও কিছু পোস্ট করেছিলাম, কিন্তু বুঝতে পারলাম, আমি আলোচনা থামাতে পারব না। কারণ, এই কঠিন সময়ে মানুষ রেগে রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আমার পরিবারের এবং ব্যান্ডের সদস্যদের অনুরোধে সব পোস্ট মুছে দিলাম।”
“এই পুরো ঘটনায় কিছু বিষয় আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে, আমরা অনেক সময় পরিস্থিতির তুলনায় নিজেদের অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। তাই মতামতের আদানপ্রদান চলে থাকে। আমার পোস্টে নেতিবাচক মন্তব্য দেখে আমি রেগে গিয়েছিলাম। মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে এই ভেবে যে, আজও এক সম্প্রদায়ের মানুষ আরেকের প্রতি কতটা অসম্মান পুষে রাখেন। আমাকে বারবার বলা হয়েছে, আমি দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত এলাকায় থাকি। সেখানে থেকে বেরিয়ে এসে সব বিচার করা উচিত। তবে আমার প্রশ্ন, প্রত্যেকের বাস্তবতার একটি পরিপ্রেক্ষিত থাকে। হয়তো মুর্শিদাবাদের গ্রামের মানুষের বাস্তবতা আমার থেকে আলাদা, কিন্তু আমি আমার সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে কিছু কথা বলেছিলাম। যদি তা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়, আমি আর কিছু বলার নেই।”
“কলকাতার যেকোনো বাঙালি শিল্পীর পোস্টের নিচে মন্তব্য দেখলেই বোঝা যায়, অর্ধেক মন্তব্য আসে এপার বাংলার বাঙালিদের, বাকিটা ওপার বাংলার। আমি এখনও বাংলাদেশে গিয়ে অনুষ্ঠান করতে পারিনি। কয়েক বছর আগে আইয়ুব বাচ্চু দমদমে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তার আগে আমি অনুষ্ঠান করেছিলাম, তবে মনে পড়ে, শো শুরুর পর আমি মাটিতে বসে পড়েছিলাম। পরমদা (অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) সঞ্চালক ছিলেন, পরে তিনি আমাকে একটা চেয়ারে বসানোর ব্যবস্থা করেন। তখন আমি বলতে চাইছি, আইয়ুব বাচ্চু আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, কোথায় বসছি তা নয়।”
“অনেকেই বলেন, শিল্পীরা হলেন ‘সফট টার্গেট’। ভালো এবং খারাপ— দুইকেই নিয়ে চলতে আমি বিশ্বাসী। আমি নিজেকে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে পরিচয় দেই, কিন্তু কখনো নিজেকে তারকা মনে করি না। কিছু মানুষ আমাকে চেনেন, শিল্পী হিসেবে ভালোবাসেন, এজন্য জীবনে অনেক সুবিধা পেয়েছি। সুবিধা যদি হাসিমুখে গ্রহণ করি, তাহলে অসুবিধাও আমাকে মেনে নিতে হবে।”
“একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলি, এই সব কটাক্ষ আমাকে তেমন প্রভাবিত করেনি। বরং মানুষের মধ্যে এত ঘৃণা দেখে আমি বিচলিত। কেউ বলতে পারেন, তাহলে কেন আমি একের পর এক পোস্ট করেছি? আমি কাউকে জবাব দিতে চাইনি। কিন্তু আমার আশপাশের মানুষ যে এতটা অসহিষ্ণু, এটা ভাবতে কষ্ট পেয়েছি। তাই পোস্ট করেছি। আমি ইতিহাস অস্বীকার করছি না, তবে আমার প্রশ্ন, আমরা কি এত রাগ নিয়ে বেঁচে থাকব? আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কি এই রাগের উত্তরাধিকার দেব?”
“মানুষ এখন রেগে রয়েছেন। আমি তো তাদের আরও মারামারি করতে বলব না। আমি সেখানে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছি, সেটাই করেছি। আমি বিশ্বাস করি, ‘একদিন পৃথিবী আবার শান্ত হবে’। তখন ‘জেমস’ পশ্চিমবঙ্গে শো করবেন, এপার বাংলার শিল্পীরা ওপার বাংলায় শো করতে যাবেন। যদিও এখন সম্ভব নয়, গত ন’বছরে যত বাংলাদেশি শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছি, তারা আমাকে ভুলবেন না। শান্তি ফিরলে, তাদের সঙ্গে আবার কাজ করার সুযোগ পেলে, আমি নিশ্চয়ই তাদের সঙ্গে কাজ করব। দুই বাংলা আবার একসাথে হাত মিলিয়ে কাজ করবে।”
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার