শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৩৬ অপরাহ্ন
আওয়ামী লীগ মনোনীত সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং প্রয়াত এইচ টি ইমামের পুত্র তানভীর ইমাম ছিলেন উল্লাপাড়া উপজেলার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। সরকারি অফিসের দরপত্র, নিয়োগ, চাঁদাবাজি এবং মনোনয়ন বাণিজ্যের সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। স্থানীয়রা জানান, তিনি উপজেলায় নিজের “রাজত্ব” স্থাপন করতে টাকার বিনিময়ে পদে বসাতেন। এইচ টি ইমামের পুত্রকে তারা অপকর্মের বরপুত্র হিসেবে অভিহিত করছেন।
এইচ টি ইমাম ছিলেন সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা, আর তারই আশীর্বাদে তানভীর ইমামের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়। ২০১৪ সালে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি, এবং পরবর্তীতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। তবে, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে কেন্দ্রের নির্দেশে মাত্র দেড় মাস পর তার পদ বাতিল হয়।
পরে উপজেলা কমিটির সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে ফয়সাল কাদির এবং সাধারণ সম্পাদক পদে গোলাম মোস্তফা নির্বাচিত হন, যাদের তিনি ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ২০১৮ সালের রাতের ভোটে আবারো এমপি হন তানভীর ইমাম, তবে ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন থেকে তিনি বঞ্চিত হন।
উপজেলায় সরেজমিনে পরিদর্শন করার পর জানা যায়, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি তানভীর ইমামের দলের নেতারাও তার হাতে জিম্মি ছিলেন। সরকার পতনের পর তিনি এবং তার অনুসারীরা আত্মগোপন করেছেন।
এছাড়া, শিক্ষার্থী শামীম রেজাকে মারধর এবং সরকারি প্রকল্পের কাজে ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দুইটি মামলা দায়ের হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর পক্ষ থেকে তাকে নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে, এবং তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত।
স্থানীয় শাহ আলম গণমাধ্যমকে জানান, তানভীর ইমামের কোনো নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে স্থানীয় প্রশাসন সবসময় তৎপর থাকতো। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে উপজেলার পূর্বদেলুয়া বাসস্ট্যান্ডে জামায়াত-শিবিরের প্রতিবাদে পুলিশের গুলিতে এক শিবির কর্মী নিহত হন। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে ব্যাপক নির্যাতন চালায়, যার ফলে ওই শিবির কর্মী মারা যান।
এছাড়া, ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সাইদুর রহমান নামক জামায়াত নেতাকে আটক করে। পরে তানভীর ইমামের নির্দেশে তার চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে তিনি মারা যান।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আজাদ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, তানভীর ইমামের নির্দেশে তাদের বিরুদ্ধে বহু মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল এবং নেতাকর্মীরা বাড়িতে ঘুমাতেও পারতেন না। এমনকি মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে তাদের পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা জামায়াতের আমির এবং সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহজাহান আলী জানান, আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা অসংখ্য মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি কারাগারে থাকার সময়েও তাদের বিরুদ্ধে আরও মামলা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নির্যাতন শুধু বিরোধী দলের নেতাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষের ওপরও চলছিল, এবং উপজেলা পুরোপুরি দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং মাস্তানির রাজত্বে পরিণত হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, তানভীর ইমামের নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তাদের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করলে বিরোধী দলের তকমা দিয়ে অজ্ঞাত আসামি হিসেবে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হত, আর একে অপরের পরিবারকেও আতঙ্কিত করা হত।