সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৪৫ অপরাহ্ন
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শিশুরা বড় হচ্ছে, তবে নিরাপত্তার প্রশ্ন জাগছে প্রতিনিয়ত
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাজ্যে শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘কারফিউ’ চালুর ভাবনা যেন এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রযুক্তির বিস্ময় আর সামাজিক মাধ্যমের দাপটে বড় হওয়া এই প্রজন্মের শিশুদের জন্য রাত ১০টার পর ইন্টারনেট বন্ধ—ভাবতেই যেন গলা শুকিয়ে আসে! যদিও সরকারের ইচ্ছা শিশুর ঘুম, পড়াশোনা আর মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য, বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এই পদক্ষেপ আসলে সমস্যার গোড়ায় পৌঁছাতে পারছে না।
যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তিমন্ত্রী পিটার কাইল সম্প্রতি জানান, দিনের বেলা স্কুলের সময় বাদ দিয়ে শিশুদের অনলাইন সময় নির্ধারণ করা হতে পারে মাত্র ২ ঘণ্টায়। রাত ১০টার পর মোবাইল বা অনলাইন গ্যাজেট ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আইনের কথা ভাবছে সরকার। মূলত ঘুমের অভাব, একাগ্রতা কমে যাওয়া এবং মানসিক চাপ বাড়ার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা থাকায় এমন চিন্তা।
তবে যুক্তরাজ্যের বাথ স্পা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার এটচেলস বলছেন, ‘শুধু কারফিউ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।’ তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষেধ করলে শিশুরা বিকল্প পথ খুঁজবে, কিন্তু আসল সমস্যাগুলো যেমন সাইবার বুলিং, আসক্তি বা ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠিকই তাদের নাগালে থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘শাটডাউন ল’-এর উদাহরণও টানেন। ২০১১ সালে ১৬ বছরের কম বয়সীদের রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত অনলাইন গেম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে ঘুমের সময় বেড়েছিল মাত্র দেড় মিনিট! শেষে ২০২১ সালে সেই আইন বাতিল হয়ে যায়।
কিংস কলেজ লন্ডনের ডিজিটাল হেলথ গবেষক র্যাচেল কেন্ট বলেন, শিশুদের মধ্যে প্রযুক্তিগত সচেতনতা ও ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। ‘কারফিউ’ দিলে তারা সেটি এড়ানোর ফাঁক খুঁজে নেবে, বরং পরিবারকেই থাকতে হবে গাইডলাইনের ভূমিকায়।
ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা যায়, ৫০ শতাংশ তরুণ মনে করেন—সময়সীমা থাকলে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হঠাৎ সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে অনেকেই পড়ে ‘ফোমো’ বা ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’-এর দুশ্চিন্তায়।
সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তৈরি হতে পারে বড় ফাটল। বিশেষজ্ঞ রিয়া ফ্রিম্যান বলেন, ‘সব শিশুর সময়সীমা তো এক নয়। একে অপরের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে তা বন্ধুত্বে প্রভাব ফেলবে এবং একাকীত্ব বাড়াবে।’
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যে ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট’। এর আওতায় শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে টেক কোম্পানিগুলোকে। তবু এটাও যথেষ্ট নয়—বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ড. কেন্ট বলেন, ‘আসলে মূল সমস্যা কনটেন্ট। সেটি নিয়ন্ত্রণে না আনলে সময়সীমা অর্থহীন।’
শিক্ষা দিতে হবে—অনলাইন দুনিয়ায় কোনটা নিরাপদ আর কোনটা নয়। শেখাতে হবে কীভাবে সাইবারবুলিং বা আসক্তি এড়াতে হয়। শিশুদের দিতে হবে মানসিক প্রস্তুতি, যেন তারা প্রযুক্তির স্রোতে গা না ভাসিয়ে, পারে নিজেকে রক্ষা করতে।
অধ্যাপক এটচেলস বলছেন, ‘প্রযুক্তি বন্ধ করা নয়, শিশুদের শেখাতে হবে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।’ কারণ, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ডিজিটাল নাগরিক। তাদের নিরাপদ রাখতে হলে দরকার বুদ্ধিদীপ্ত পথ—not শুধু নিষেধ।