শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:২৫ অপরাহ্ন
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, তরুণদের সংখ্যা বেশি। তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহী। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মতামত নেয়ার জন্য আমি মনে করি ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ বছর নির্ধারণ করা উচিত।
শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর ফার্মগেট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ আয়োজিত দুই দিনব্যাপী জাতীয় সংলাপ-২০২৪-এর উদ্বোধনী ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি ভাষণ দেন।
সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, এ জন্য সর্বশেষ পর্যায়ে জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন করা হয়েছে। যেমন ধরুন, একজন নাগরিকের ভোটার হওয়ার বয়স নির্ধারণে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বয়স আছে। নির্বাচন সংস্কার কমিশন নিশ্চিতভাবেই এ বিষয়ে একটি সুপারিশ করবে। সেই বয়স আমার পছন্দ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। যেমন আমি তরুণদের দ্রুত ভোটার করার পক্ষে। কারণ, যত তরুণ হবে, পরিবর্তনের প্রতি তাদের আগ্রহ তত বেশি হবে। তরুণদের এ আগ্রহ তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকেই আসে। তাদের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে তারা আগ্রহী। এ কারণে আমি মনে করি, ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ বছর করা উচিত।
তিনি বলেন, নির্বাচন সংস্কার কমিশন কোন ধরনের সুপারিশ করবে, তা আমি জানি না। তবে দেশের বেশিরভাগ মানুষ যদি কমিশনের সুপারিশ করা বয়স গ্রহণ করে, আমি ঐকমত্য গড়ার স্বার্থে তা মেনে নেব।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সংস্কারের যে মহান দায়িত্ব ঐতিহাসিক কারণে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে, তা আমাদের প্রত্যেককে যার যার অবস্থান থেকে পালন করতে হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে এই মহাযজ্ঞে একসঙ্গে অংশ নিতে হবে।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশকে মুক্ত করেনি, এটি আমাদের স্বপ্নকেও সাহসী করেছে। বাকহীন বাংলাদেশ পুনরায় কথা বলার শক্তি অর্জন করেছে। এই শক্ত কণ্ঠ ঐক্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ঐক্য আমাদের মূল শক্তি।
জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত পাঁচ মাসে এই ঐক্য আরও সুসংহত হয়েছে। বিরুদ্ধ শক্তি বিভক্তির চেষ্টা করলেও, ঐক্য মজবুত হয়েছে। এই ঐক্যের শক্তিতে আমরা এখন অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারি। আমাদের এখনই এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে যা বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সুযোগ নিশ্চিত করবে।
তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের পরিবারে জন্মালেও প্রতিটি নাগরিক যেন বাধা ছাড়াই নিজের সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে পারে। এমন রাষ্ট্র গড়তে হবে যেখানে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু পরিচিতি তুচ্ছ হয়ে যাবে। সবার পরিচয় হবে একটাই—‘আমি বাংলাদেশের নাগরিক।’
ড. ইউনূস আরও বলেন, রাষ্ট্রের কাছে আর অন্য কারো কাছে নিজের পরিচয় দিতে হবে না। দেশের ভেতরে বা বাইরে কোথাও প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক থাকবে না। আমরা হব বিশ্ব নাগরিক। দেশের মঙ্গল সাধন যেমন আমাদের দায়িত্ব, তেমনই বিশ্বের কল্যাণে অবদান রাখাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের তরুণরা এই দ্বৈত দায়িত্ব পালনে প্রস্তুতি নেবে।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যোদ্ধাদের স্মরণ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ছাত্র-জনতার প্রতি। তাদের আত্মত্যাগ নতুন বাংলাদেশ গঠনে প্রেরণা হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা নতুন পর্বে প্রবেশ করেছি। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়া। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ছাড়া শহীদদের আত্মত্যাগ অর্থহীন।
ড. ইউনূস বলেন, ফ্যাসিবাদ আমাদের আদর্শিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করেছিল। আমরা আবার সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে যাচ্ছি।
তিনি উল্লেখ করেন, ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন—এই তিনটির মধ্যে কোনোটি বাদ দিলে অন্যটি সফল হবে না। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন কিংবা ঐক্য ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়।
সংস্কার ও নির্বাচনের প্রস্তুতি একসঙ্গে চলবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতি নির্বাচন কমিশনের কাজ। কিন্তু সংস্কারে সকল নাগরিককে অংশ নিতে হবে।
তিনি বলেন, নাগরিকদের জন্য সংস্কারের কাজ সহজ করতে ১৫টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন জানুয়ারিতে পাওয়া যাবে। প্রত্যেক কমিশন তার ক্ষেত্রে সুপারিশ করবে, যা জাতিকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
সংস্কারের কাজ দ্রুত শেষ করতে চান উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, বিভিন্ন মতামত সত্ত্বেও আমরা দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছাতে চাই। এই সংলাপ সবাইকে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া প্রণয়নে সহায়তা করবে।
তিনি সংলাপের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।